শ্রাবণ সংখ্যা
যা-কিছু জীর্ণ আমার, দীর্ণ আমার, জীবনহারা, তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা। নিশিদিন এই জীবনের তৃষার 'পরে, ভুখের 'পরে শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে ॥

জিকির
জানালার মুঠি থেকে জানালার ফুল খসে পড়ে এখন সকলের আলোয় রোজা মুখে বসে থাকি। সরকারি পাখিদের গান শুনি পুতুলের নিয়ন্ত্রিত খেলা শেষে—

মূল্যবোধের অবক্ষয় ও বর্তমান প্রজন্ম
একটা সময় ছিল, যখন সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই উঠোনে জ্বলে উঠত আলো-প্রদীপ, আর মানুষের ভেতরে জ্বলে উঠত গল্পের আলো। নানি-দিদা-ঠাকুমার কণ্ঠে শোনা নীতিকথা, বাবার শাসনে লুকোনো মমতা, মায়ের চোখে নিঃশব্দ শিক্ষা- এসবই গড়ে তুলত মানুষের ভিত। আজও আলো জ্বলে, কিন্তু তা প্রদীপের নয়- মোবাইলের স্ক্রিনে; আজও শব্দ আছে, কিন্তু তা কথোপকথনের নয়- নোটিফিকেশনের। আলো বেড়েছে, অথচ অন্ধকারও গভীর হয়েছে- এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

শৌভিক দত্তের ৪টি কবিতা
ডালপালা কেটে যাওয়ার পর অখণ্ডতা আমার পরোয়া করে না। কোথাও দশদিক নেই। হাতের বালকে অরণ্য ফুরিয়ে আসে। এই অশক্ত শীতে ভুলে যাওয়া কোনও ডুবোজাহাজ খুলে সম্মোহণগন বেরিয়ে এসেছে। পদাতিক গণিতে রাখা ভীড়ের ছররা কিছু। পতাকাগলিতে।

শ্রাবণের কাব্য-ধারা
বর্ষার লাবণ্যময় পরিবেশে কবিহৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠেছে যুগে-যুগে। মায়াময় অলকাপুরীতে কবিমন বারবার ছুটে গেছে। কালিদাস তাঁর ‘মেঘদূতে’ পর্বতের ওপারে নির্বাসিত শূন্য ও একাকী জীবনে ‘মেঘ’কে দূত করে পাঠিয়েছেন প্রিয়ার কাছে। 'ও মেঘ, জানি আমি জাতকপত্রিকা, ভুবনবিখ্যাত পুষ্কর তোমার নাম জানি তোমার গুণপনা ইচ্ছামতো পারো উড়িতে প্রধান ইন্দ্রের ও মেঘ, প্রিয়া দূরে, তোমার কাছে তাই প্রার্থী- ক্ষতি কী গুণবানে বিফল হই যদি, অধমে গ্লানিময় যাচ্ঞা।' - মেঘদূত (পূর্বমেঘ), অনুবাদ- শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

চারটি কবিতা
ছায়া দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছি বন, একটা টলটলে পুকুর, আর তিনটা হাঁস। শৈশবে আমি ভাবতাম একটা প্রজাপতির ভেতর হলুদ ডানার বিস্তার ছাড়া আর কিছু নেই। ভাবতাম প্রজাপতির জন্ম রাইখেতে। এখনো তাইই ভাবি। প্রজাপতি মন্ত্র পড়বার পর একবার মনে হল ভুলে যাই শৈশব। কিন্তু মানুষ এমনই বিপন্ন প্রাণী, শৈশব ছাড়া সবকিছুই ভুলে যায়। যাদের অ্যালঝাইমার হয় তাদেরও শৈশব মনে থাকে শেষের আগ পর্যন্ত। আর যখন শৈশবও ভুলে যায় তখন তারা শিশু হয়ে যায়। আর ছায়া দিয়ে মুড়িয়ে রাখে বুড়ো আঙুলের নখ, যদি নখের আয়নায় আলো লেগে দৃশ্যমান হয় ফুরিয়ে যাওয়া জীবনের ঘ্রাণ।

গো বি ন্দ চ ক্র ব র্তী র কয়েকটি কবিতা
আমার মেয়ে নীল প্রজাপতির পাখায় এঁকে দেয় একটি সকাল

নুরুল হাসানের দুটি কবিতা
তুমি ভালোবাসলে কি ইরান-ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হয়ে যেত? তুমি ভালোবাসলে কি ধার্মিকরা হঠাৎ করে মানুষ হয়ে যেত? তুমি ভালোবাসলে কি বন্ধ হয়ে যেত শাসকের শোষণ-প্রবৃত্তি? তুমি ভালোবাসলে কি বন্ধ হয়ে যেত পাহাড়-জঙ্গল চুরি? জানি না! তুমি ভালোবাসলে কী হত।

স্পর্শময়ী
তুমি এসে আচানক স্পর্শ দিলে ঠোঁট প্রদেশে, দেহ মানচিত্রের অলিতে-গলিতে...! তারপর ঝড় বইলো পা থেকে মাথা অবধি। প্রতিটি রোমকূপের গোড়ায়, শিরা-উপশিরায়, রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্পর্শের নান্দনিক ছোঁয়ায় যেন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল অদাহ্য আগুনের লেলিহান শিখা পিপাসায় কাতরাতে কাতরাতে লবণ সমুদ্রে ডুব দিলাম... ডুব দিতেই থাকলাম... দিতেই থাকলাম!

দুটি কবিতা
দুপুরের বিপরীত মেঘের হুইসেল বেজেছে আজ স্মৃতি জমেছে—পাখি ও প্রার্থনার মতো। নিঃসঙ্গ কেবিন আর শাদা আলোর ভেতরে নিয়তির অন্ধকার ঘন হয়ে এলো আরও কোথাও জীবন অবমাননা করেছে নিজেকে।

আমেনা দুধেরও বাছা
তরমুজ ব্যবসায়ী হারুনের সাথে যখন আমেনার বিয়ে হয়, সেই বছরের মাঘ মাসের শীতে আলেয়ার আলো খুব দেখা যাচ্ছিল। দূরে তাল,নিম আর শিরিষগাছের ফাঁক দিয়ে আলেয়ার আলো নিভু নিভু—কেঁপে কেঁপে সম্ভ্রমে লজ্জায় হেঁটে উধাও হয়ে যেত। মনে হত কেউ মধ্যরাতে চার্জহীন টর্চ লাইটটাকে থাপড়াতে থাপড়াতে ; পেটের ভুটভাট অত্যাচার থামাতে পায়খানার দিকে যাচ্ছে।

ফালুটে বিড়ম্বনা (পর্ব এক)
কদিনের মধ্যেই গোয়েচালা যাব ঠিক হয়েই আছে- এরইমধ্যে একদিন বাড়ি ফিরতেই মা বলল, " সান্দাকফু যাবি নাকি?" মুখে বললাম, "আআআবাআআর", কিন্তু মনে মনে তো, "স্যাকটা তাহলে গুছিয়ে ফেলি।"

আত্মমৈথুনিক স্বভাবে
অথচ এই ঘনানো অন্ধকার হয়তোবা থেকে যাবে রয়েছে তো সুদীর্ঘকাল ফুল হয়ে হয়তোবা গেলাসের জলে স্ফূর্তি ও সঙ্গম বিলাপের বন্দিশ আরবার

ফালুটে বিড়ম্বনা (অন্তিম পর্ব)
সকালের প্রথমার্ধের রোদের মনোরম উষ্ণতার আবেশ শরীরে - মননে মেখে ছন্দে ছন্দে চলি আনন্দে। লাল তেকোনা ছাদবিশিষ্ট একাকী ছোট্ট বাড়িটার মাথার ওপর খাটানো নীল বিনি পয়সার তাঁবু আর তার পাশেই অতিক্ষুদ্র জলাশয়ে নীল আকাশের ছায়াকে উদ্বেলিত করে স্তব্ধতার গান। আনমনা মন এড়াতে পারেনা থুরি এড়াতে চায়না টুমলুর মায়াবী আকর্ষণ। "ভালবাসি বিশ্বের সুষমার ছবিটি"

সমরজিৎ সিংহের কয়েকটি কবিতা
পড়বে না আমার কবিতা ? তাতে কিছু হবে ? কথা ছিল আমার লেখার । ভাবিনি, পড়বে ।

কবিতা
যুবকদের যে গম-বিলাস যে হরিণগল্প স্থানান্তরের পর গোড়া খুঁজছে মালিকের মেয়ে ব্যালকনিতে বাড়ছে বেলা আসলে ওই গম ও বিলাস আর হাতেনাতে ধরা পড়ছে যুবকের দল হরিণীর গল্পে

আমাদের যুদ্ধ জারি থাকবে
আগুন আগুন আগুন জ্বলছে আমাদের বুকে-পেটে-মাথায় শ্রাবণের ফোঁটাগুলো যেন এক একটা পেরেক অন্ধ করে দিচ্ছে আমাদের চোখ আমাদের স্বপ্নগুলোকে খোরাক বানিয়ে হাসাহাসি করছে

অর্ঘ্য রায় চৌধুরীর দুটি কবিতা
সমস্ত উৎসব ফুরিয়ে গেছে বলেই সন্ধ্যা নেমে এল মেঠো পথ, বহুদূরে গাছেদের সারি বিকেলের আলোটুকু ম্লান এখন কোথায় যেতে পারো তুমি? অন্ধকারে হাতড়ে বেরিয়েছো চেনা পথ পুরোনো দরজায় কড়া নেড়ে দেখেছো বন্ধ হয়ে গেছে সমস্ত চিঠিদের চোখ এখন এক চোরাবালি জেগে উঠেছে ধূ ধূ চর, ওইপারে নিঃঝুম গ্রাম এইখান থেকে আজ ফিরে যেতে পারো।

ব্রাত্য ঈশ্বর ও সৃষ্টির সংলাপ
মানুষ শূন্য পৃথিবীর পায়ুপথে একটা আপেল গাছ রোপন করার পর আমি সোজা হাঁটা ধরলাম নরকের দিকে। পথে দেখা হলো ক্রশবিদ্ধ যিশুখ্রিষ্টের সঙ্গে। পথে দেখা হলো নূহের পুত্র কেনানে'র সঙ্গে। প্রত্যেকে তাঁদের নিজের পিতার বিরুদ্ধে কথা বলছেন।

ফালুটে বিড়ম্বনা (পর্ব দুই)
গাড়িটা অনুভূমিক হতেই একসঙ্গে সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আজ কি পূর্ণিমা নাকি ? কই তেমন তো শুনিনি। সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের ফলকটা স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে এই নিশীথে। স্মৃতির অ্যালবামের সাথে যে কোনো মিলই নেই। নিঃসন্দেহে আমরা পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ স্থানে আরোহন করেছি - তবে হঠাৎ এত আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। এরই নাম উন্নয়ন - প্রকৃতি-মা-এর সৌন্দর্যায়ন হয়েছে আধুনিকতার লম্ফ জ্বেলে। বোঝো ঠেলা এক শহর থেকে নিষ্কৃতি পেতে এলেম কিনা আরেক শহরে!

অপরাহ্নের পর
কিছু দুপুর আছে, বিকেলের আগেই শেষ হয়ে যায়। জানালার পাশে বসে টের পাই। রোদটা ধীরে ধীরে দেয়াল বেয়ে ওঠে, তারপর হারিয়ে যায়। ওই সময় কোনো কাজ করতে ইচ্ছা করে না। বই খুলে বসি, দুই পৃষ্ঠা পড়ি, তারপর খেয়াল করি দশ মিনিট ধরে একই লাইনের দিকে তাকায়ে আছি। শব্দগুলো চোখে ঢুকছে, মাথায় ঢুকছে না। অভিমান করেছে ভাষা। অমন সময় শহরের পুরনো জায়গাগুলাতে ফিরতে ভাল লাগে। নতুন ক্যাফে, নতুন রেস্টুরেন্ট, নতুন সাজসজ্জা খুব একটা টানে না। সেই চায়ের দোকানে যাই, যার বেঞ্চিটার একপাশ একটু নিচু। সেই বইয়ের দোকানে ঢুকি, যেখানে মালিক এখনো প্রতিবার জিজ্ঞেস করে, নতুন কবিতার বই লাগবে?

নিজের ঠিকানা কিছু নাই
নিজের ঠিকানা খোঁজা জন্ম থেকেই শুরু আজীবন চলে সেই খোঁজা – কতো আসে কতো যায় জন্ম মৃত্যু ‘কাল’ পায় বয়ে চলা কতো শত বোঝা!

সবুজ শ্যাওলা
বিভাস মূর্খ, পকেটে টাকাপয়সা আছে, জামাটা ইস্ত্রি করা হয়নি, জামার কোথাও কোথাও হলুদ ছোপ ছোপ, তরকারি মেখে ওই অবস্থা হয়েছে হয়তো, হাফপ্যান্ট এবং একটি হাওয়াই চটি, গ্রীষ্মের সকাল সাড়ে দশটার সময় একটি মিষ্টির দোকানের বেঞ্চের উপর বসে আছে। কয়েকটা মাছি ছাড়া এই মুহূর্তে মিষ্টির দোকানটায় কেউ ঢুকছে না, আবার বেরোচ্ছেও না।

শবমুখ এমন
শবমুখ আমার দিকে এমন তাকিয়েছিল শোকযাত্রার মাঝখানে যে তৎক্ষণাৎ প্রতিদ্বন্দ্বীতার উচ্চকিত খেলায় না নেমে বাড়ি ফিরে এলাম আমি। বাড়ি না ফিরে কী করা যেত? মেঠোপথে ঘাস, শিশিরভেজা, জড়ানো আলোর তন্তুজালে।

ঘুড়ি কেটে গেলে
কতটা দূরে গেলে তাকে বিচ্ছেদ বলি আবহমান কাল থেকে খসে বৈচিত্র্য শহর নামক খাঁচায় গচ্ছিত জীবনে শুধু দৌড়ঝাঁপ এদিক থেকে ওদিকে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে রহস্যময় ঘনঘটা মেঘ

কবিতারা
আলো দেখা হেরে গেল আলো জ্বালানোর কাছে হেরো আলো আর বিজয়ী আগুন আমার সঙ্গেই থাকে মাথা কোটে মাথা কাটে

রহিত ঘোষালের দুটি কবিতা
রোয়াকে রোদ্দুর, অপরিসীম বিকেল, শ্যামাঙ্গিনী আকাশ, কাঁটাজঙ্গল, ভাগচাষিদের ঘর, ঘরের ক্রন্দনধ্বনি— এই সারাংশ। কাদাজমি থেকে উঠে আসে ঘরগেরস্থি, বুকের শিলাস্তরে ফাটল ধরে— সম্পর্কের পর্বতমালা রমণ চায়, লঞ্চ চলে যায় সাঁঝবেলায় কথার হবিষ্যি আর ছাড়পত্র নিয়ে,

শাশ্বত ভট্টাচার্য্যের কয়েকটি কবিতা
স্টেশন পাড়ার মোড়ে ট্রেন থেকে দেখতে দেখতে জাম রঙের সন্ধ্যা দক্ষিণের দুয়ারে নেমে এলে , পাঁচটি চিল মেঘ হয়ে যায় দুয়ারে সারমেয়টা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হাই তুলছে, তুমি এলে উষ্ণতা পাবে খড়কুটো....

জীবনের আসল পরিচয়
যখন ভেঙে পড়ে ভাগ্যের সব আশ্রয়, তখন মেলে জীবনের আসল পরিচয়। অবলম্বন সকলই হয়ে পড়ে শিথিল, অভিমানের কৃষ্ণগহ্বরে সম্পর্ক হয় বিলীন।

অস্তরাগ
আকাশে ফুলকি ছোটে উপাসনা গৃহে কান পাতে দু’টি বুড়ো কাক সেদিনও যে রাস্তা চলেছে নদীর গানে সেখানে ঢেলে গেছে কেউ ধুলো ভরা ফুসফুসের অস্তরাগ

শৌভিক দত্তের ৪টি কবিতা
ডালপালা কেটে যাওয়ার পর অখণ্ডতা আমার পরোয়া করে না। কোথাও দশদিক নেই। হাতের বালকে অরণ্য ফুরিয়ে আসে। এই অশক্ত শীতে ভুলে যাওয়া কোনও ডুবোজাহাজ খুলে সম্মোহণগন বেরিয়ে এসেছে। পদাতিক গণিতে রাখা ভীড়ের ছররা কিছু। পতাকাগলিতে।

শ্রাবণের কাব্য-ধারা
বর্ষার লাবণ্যময় পরিবেশে কবিহৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠেছে যুগে-যুগে। মায়াময় অলকাপুরীতে কবিমন বারবার ছুটে গেছে। কালিদাস তাঁর ‘মেঘদূতে’ পর্বতের ওপারে নির্বাসিত শূন্য ও একাকী জীবনে ‘মেঘ’কে দূত করে পাঠিয়েছেন প্রিয়ার কাছে। 'ও মেঘ, জানি আমি জাতকপত্রিকা, ভুবনবিখ্যাত পুষ্কর তোমার নাম জানি তোমার গুণপনা ইচ্ছামতো পারো উড়িতে প্রধান ইন্দ্রের ও মেঘ, প্রিয়া দূরে, তোমার কাছে তাই প্রার্থী- ক্ষতি কী গুণবানে বিফল হই যদি, অধমে গ্লানিময় যাচ্ঞা।' - মেঘদূত (পূর্বমেঘ), অনুবাদ- শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

চারটি কবিতা
ছায়া দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছি বন, একটা টলটলে পুকুর, আর তিনটা হাঁস। শৈশবে আমি ভাবতাম একটা প্রজাপতির ভেতর হলুদ ডানার বিস্তার ছাড়া আর কিছু নেই। ভাবতাম প্রজাপতির জন্ম রাইখেতে। এখনো তাইই ভাবি। প্রজাপতি মন্ত্র পড়বার পর একবার মনে হল ভুলে যাই শৈশব। কিন্তু মানুষ এমনই বিপন্ন প্রাণী, শৈশব ছাড়া সবকিছুই ভুলে যায়। যাদের অ্যালঝাইমার হয় তাদেরও শৈশব মনে থাকে শেষের আগ পর্যন্ত। আর যখন শৈশবও ভুলে যায় তখন তারা শিশু হয়ে যায়। আর ছায়া দিয়ে মুড়িয়ে রাখে বুড়ো আঙুলের নখ, যদি নখের আয়নায় আলো লেগে দৃশ্যমান হয় ফুরিয়ে যাওয়া জীবনের ঘ্রাণ।

গো বি ন্দ চ ক্র ব র্তী র কয়েকটি কবিতা
আমার মেয়ে নীল প্রজাপতির পাখায় এঁকে দেয় একটি সকাল

নুরুল হাসানের দুটি কবিতা
তুমি ভালোবাসলে কি ইরান-ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হয়ে যেত? তুমি ভালোবাসলে কি ধার্মিকরা হঠাৎ করে মানুষ হয়ে যেত? তুমি ভালোবাসলে কি বন্ধ হয়ে যেত শাসকের শোষণ-প্রবৃত্তি? তুমি ভালোবাসলে কি বন্ধ হয়ে যেত পাহাড়-জঙ্গল চুরি? জানি না! তুমি ভালোবাসলে কী হত।

স্পর্শময়ী
তুমি এসে আচানক স্পর্শ দিলে ঠোঁট প্রদেশে, দেহ মানচিত্রের অলিতে-গলিতে...! তারপর ঝড় বইলো পা থেকে মাথা অবধি। প্রতিটি রোমকূপের গোড়ায়, শিরা-উপশিরায়, রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্পর্শের নান্দনিক ছোঁয়ায় যেন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল অদাহ্য আগুনের লেলিহান শিখা পিপাসায় কাতরাতে কাতরাতে লবণ সমুদ্রে ডুব দিলাম... ডুব দিতেই থাকলাম... দিতেই থাকলাম!

দুটি কবিতা
দুপুরের বিপরীত মেঘের হুইসেল বেজেছে আজ স্মৃতি জমেছে—পাখি ও প্রার্থনার মতো। নিঃসঙ্গ কেবিন আর শাদা আলোর ভেতরে নিয়তির অন্ধকার ঘন হয়ে এলো আরও কোথাও জীবন অবমাননা করেছে নিজেকে।

আমেনা দুধেরও বাছা
তরমুজ ব্যবসায়ী হারুনের সাথে যখন আমেনার বিয়ে হয়, সেই বছরের মাঘ মাসের শীতে আলেয়ার আলো খুব দেখা যাচ্ছিল। দূরে তাল,নিম আর শিরিষগাছের ফাঁক দিয়ে আলেয়ার আলো নিভু নিভু—কেঁপে কেঁপে সম্ভ্রমে লজ্জায় হেঁটে উধাও হয়ে যেত। মনে হত কেউ মধ্যরাতে চার্জহীন টর্চ লাইটটাকে থাপড়াতে থাপড়াতে ; পেটের ভুটভাট অত্যাচার থামাতে পায়খানার দিকে যাচ্ছে।

আত্মমৈথুনিক স্বভাবে
অথচ এই ঘনানো অন্ধকার হয়তোবা থেকে যাবে রয়েছে তো সুদীর্ঘকাল ফুল হয়ে হয়তোবা গেলাসের জলে স্ফূর্তি ও সঙ্গম বিলাপের বন্দিশ আরবার

জিকির
জানালার মুঠি থেকে জানালার ফুল খসে পড়ে এখন সকলের আলোয় রোজা মুখে বসে থাকি। সরকারি পাখিদের গান শুনি পুতুলের নিয়ন্ত্রিত খেলা শেষে—

গাছ
চুপ করে বসে থাক আর শোন। গাছেরাও কথা বলে জানলাম কাল। সকালে হাই তোলার মত করে গাছেরাও শব্দ করে শুকনো,ভেজা পাতাগুলোকে ঝেড়ে ফ্যালে সকালের প্রথম হাওয়ায়। তারপর একটু হাত পা নাড়িয়ে ব্যায়াম করে, সকালের রোদে। শুকনো ডালগুলোর মড়মড় আওয়াজ শুনলে বুঝবি।

দুধারে ঈশ্বর
একটি প্রাণবন্ত ফুঁয়ে একরাশ আঙুল এ কেমন বিমল ফুল নীল হাত নেড়ে বলে প্রজাপতি ছেলেবেলা তার ক্যাপশন

চিঠি
ফিরে আসা চাঁদের উসকানি ঢুকে যাচ্ছে মাথার ভেতর মেঘের হাত ধরে পাথর খুঁজতে যাব তোমার কিনারে।

সম্পাদকীয়
মড়ক লেগেছে নাকি খরা ! বাঙালি মনন বাঙালির ভাষা, বিস্মৃত তার ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব । সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে এই ধারণা ভীষণ রকম ভুল বলে প্রমাণিত হবে। বছরে বছরে যেভাবে গজিয়ে উঠছে অগণন লিটিল ম্যাগাজিন , সামাজিক মাধ্যমে অবিরত বয়ে যাচ্ছে সাহিত্যের বহতা ধারা ।

গণিত, অথচ
অ্যাম্বুলেন্সের ডালা খোলা আছে গাছের শরীরে অন্য গাছের ছায়া তবু ওভারল্যাপ এইসব দৃশ্যভাবনার পাশে ঠোঁট, বরফ, বরফ কঠিন ঠোঁট গল্প বদলে যাচ্ছে

সোয়েটার
গন গনে নীল শিখা মেলে গ্যাসের উনুন জ্বলছে। কেটলিতে জল সেই কখন থেকে ফুটে চলেছে। বাষ্প হয়ে অর্ধেক জল মরে গেছে। সেই দিকে কোনও খেয়াল নেই নীলার। সে একটা বেতের গদি মোড়া আরাম চেয়ারে বসে আছে। কিচেনটা ঢের বড়। প্রায় প্রমাণ সাইজ একটা ঘরের মতো। এখানে বসে উলের কাঁটায় শব্দ তুলে সোয়েটার বুনে যাওয়া তার একমাত্র বিলাসিতা। শীতের দিনে আগুনের এই উত্তাপটা কী যে আরামের, নীলা তা কাউকে বোঝাতে পারবে না। গ্যাসটা কতক্ষণ জ্বলছে সে দিকে তার কোনও খেয়াল নেই। চায়ের জল বসানোটা আসলে একটা ছুতো। শীতের রাতে আগুনের উষ্ণতাকে সে প্রাণ ভরে উপভোগ করে নিচ্ছে। গ্যাস পুড়ছে পুড়ুক। সেই নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। তার স্বামী বিপুলের টাকার অভাব নেই। তারা বিশাল ধনী না হতে পারে কিন্তু এই সব সামান্য বে-হিসেবী খরচ করার মতো তাদের ঢের পয়সা আছে।