৭ মে, ২০২৬
কয়েকটি কবিতা
কয়েকটি কবিতা
ধোঁয়ার বর্ণমালা

 
শহরের দেওয়ালে
ধর্মের নাম লেখা আছে,
কিন্তু অক্ষরগুলো ধোঁয়ায় গড়া—
ছুঁলেই ছাই।

একটি বই খোলা থাকে প্রতিদিন,
পাতা ওল্টায় বাতাস
অর্থ পড়ে না কারও হাতে—
শুধু মুখস্থ থাকে আগুনের উচ্চারণ।

মাংসের গন্ধে নয়,
রক্তের দাগে নয়,
মানুষ চেনা যায়
নীরবতায় সে কোথায় দাঁড়ায়।

একটি চিৎকার
দুই নামে ভাগ হয়ে যায়,
শবটি পড়ে থাকে মাঝখানে—
পরিচয়হীন।

আগুন যখন নামে,
সে কোনো প্রার্থনা বোঝে না,
তবু মানুষ আগুনকে শেখায়
কাকে ছুঁতে হবে।

দেবতারা আজ
নিজেদের নাম ঢেকে রাখে,
কারণ মানুষ নাম উচ্চারণ করলেই
কেউ একজন পুড়ে যায়।

রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
মানুষ নিজের দিকে তাকায়—
প্রশ্ন করে না,
শুধু দেখে
সে এখনো মানুষ কি না।

 

 
অস্তিত্বের জ্যামিতি

 
​আত্মমর্যাদা নশ্বর প্রসাধন নয়—
এ এক গূঢ় মহাকর্ষ,
নিজস্ব ধ্রুবপথে সত্তার স্থির অবস্থান।

​অন্যের দর্পণে আদল খোঁজা—
এক ভ্রান্ত প্রতিসরণ;
প্রতিটি আপসে মুছে যায়
নিজের মৌলিক বর্ণমালা।

​জনারণ্যে দ্রবীভূত হওয়া কৌলিন্য নয়,
অপ্রয়োজনীয় দুয়ারে—
নিজের ‘অনুপস্থিতির ভাস্কর্য’ খোদাই করাই সার্বভৌমত্ব।

​ব্যক্তিত্বের এই অলঙ্ঘ্য বৃত্ত—
এক ঋজু নন্দনতাত্ত্বিক স্থাপত্য।

​অমূল্যায়িত পরিসর থেকে প্রস্থানেই—
শ্রেষ্ঠ শৈল্পিক দ্রোহ।
অক্ষত প্রত্যাবর্তনই
নিজস্ব দিগন্ত পুনর্নির্মাণের রণকৌশল!

 

 
বাবার নিঃশব্দ ছায়া

 
মধ্যরাত্রির নিঃসীম শূন্যতা চিরে যখন তাঁর পদধ্বনি-তরঙ্গ বাজে,
আমার অস্থির পাঁজরের জ্যামিতিতে তখন এক আদিম প্রশান্তির জলরঙ ফুটে ওঠে।
পৃথিবীর যাবতীয় পতন আর মহাকর্ষীয় টানকে যিনি অবলীলায় রুখে দেন,
তিনি আসলে এক নৈঃশব্দ্যের স্থাপত্য—যাঁর দীর্ঘ ছায়ায় আমার অবাধ্য শৈশব খুঁজে পায় কেন্দ্র।

ভালোবাসার প্রথাগত ব্যাকরণে তাঁর কোনো অধিকার নেই
‘আলিঙ্গন’ কিংবা ‘স্নেহ’ শব্দগুলো তাঁর কাছে হয়তো কোনো দূরবর্তী নক্ষত্রের ভাষা।
অথচ তাঁর জীর্ণ পরিধেয়টির রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রতিটি ছিন্ন তন্তুর বুননে—
আমার দীর্ঘায়ুর জন্য এক অলৌকিক উপাসনা গোপন জ্যামিতিতে সেলাই করা থাকে।

তিনি সেই স্বয়ংসিদ্ধ নীলকণ্ঠ, যিনি নোনা ঘামের বিন্দুতে বুনে চলেন আমার স্বপ্নের কারুকাজ
যাঁর কর্কশ করতলের রেখায় অঙ্কিত থাকে আমার আগামীর মানচিত্র।
কথার পিঠে কথা সাজিয়ে তিনি কখনও উচ্চকিত ঘোষণা করেননি—'ভালোবাসি';
বরং নিজের অস্তিত্বকে ধূপের মতো ক্ষয় করে লিখে গেছেন এক নিঃস্বার্থ প্রার্থনার উপাখ্যান।

 

রঙের অন্তর্ঘাত

 
তুমি যে ঋতুর নাম উচ্চারণ করো
আমি তার অন্তঃস্থ দহন দেখি
ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়,
শিরায় শিরায় ওঠা অজ্ঞাত উত্তাপে।

শুকনো ডালের ভেতর সবুজের নীরব অন্তর্ঘাত
অদৃশ্য রস ধীরে ধীরে লিখে যায় পুনর্জন্মের চিঠি।
পাতাঝরার শোকসভা ভেঙে
আলো নিজের শরীর বদলায় নিঃশব্দে।

লাল এখানে কেবল রঙ নয়
এ এক প্রাচীন প্রতিবাদ,
মাটির গভীর থেকে উঠে আসা
অদম্য স্পন্দনের স্বাক্ষর।

বাতাসে ভেসে থাকে অঘোষিত উন্মাদনা
অবদমিত শব্দেরা ডানা মেলে।
দূরের বন তার নিস্তব্ধতা ভেঙে
নিজেকেই নতুন নামে ডাকে।

প্রেম এখানে কোনো ব্যক্তিগত উচ্চারণ নয়—
এ এক সমষ্টিগত জ্বর,
যেখানে মানুষ, বৃক্ষ আর পাখি—
একই আগুনে অনুবাদিত হয়।

ঋতু বদলায় মানচিত্রে নয়
বদলায় অন্তরের অনুচ্চারিত অঞ্চলে
যেখানে রঙ মানে বিপ্লব
আর দহন মানে আরেকটি সূচনা।

 

 

এখনও কোনও মন্তব্য নেই

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।