
অঙ্ক কষে মানুষ পাওয়া যায় না, তবু মানুষ কিন্তু অঙ্কই কষে যায়।
সকালবেলা জানালার ধারে বসে সম্ভাবনার অঙ্কগুলো কষতে কষতে ভাবছিল শুভ। এম এস সি পাশ করল দুবছর হল। চাকরি বাকরি এখনো পায় নি, চেষ্টা করে যাচ্ছে। চেষ্টার চক্করে অনেক বন্ধু বান্ধবী দূরে চলে গেছে। একটা সময় পর "চেষ্টা করছি" এই শব্দটা কাঁটার মত বিঁধে। শুভ ও সেই কাঁটা নিয়ে বেঁচে আছে।
আজকে রবিবার, জানালায় আলো এসে পড়ছে, অঙ্ক করার খাতায় কলমটা রেখে শুভ ভাবছিল সম্ভাবনার অঙ্কগুলো হয়ত একদিন শিখে যাবে। কিন্তু মানুষ কি সম্ভাবনার তত্ত্ব মানে? যদি মেনে চলত তাহলে অনেককেই অঙ্ক কষে সমাধান করে নিজের কাছে রেখে দিত।
মানুষের পেট নামে একটা বস্তু আছে ওটা যদিও এসব মানে না শুধু খাই খাই করে নিয়মিত । ওটা সম্ভাবনার মত জটিল নয়। ওর খাই খাই এর কারনে শুভ হোটেলে গেল খেতে।
হোটেলে একটা ৫০-৬০ বছরের শক্তপোক্ত লোক বসে আছে। গালভরা দাঁড়ি, উশকো খুশকো চুল গলায় একটা বাদামী মাফলার প্যাঁচানো আর গায়ে একটা কালো জাম্পার। খাচ্ছে আর কার সাথে যেন কথা বলছে।
-ধ্যুৎ দিনটায় মাটি গেল আজি। বউনিও হয় নাই এলাং। বাড়িয়ালিরটে খাতাপত্রগিলা পাইলে আজি ভাল হইল হয়।
ওদিক থেকে কি কথা বলল ঠিক শোনা গেল না। লোকটা বলল
-হুম ঠিক আছে রাখং, রাতিত কথা হবে।
শুভর এমনিতে এখন মানুষের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। লোকটার সামনের লাল চেয়ারটায় বসে একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল
-কি হইছে?
- আর কইস না। সকাল থাকি মোর নসিবটায় খারাপ আজি। বউনিও হয় নাই। মুই ভাঙাড়ির ব্যবসা করং, ওই লোহা, টিন ভাঙা, পুরানো বই, খাতা ব্যাচে খাং। একটা বাড়িত বিশ বছর থাকি ভাড়া আছং ওই চাচির সব কাজত থাকং, মোর কাজ ছাড়ি উমার কাজ করি দেং।আর আজি যেলা বাড়ির আগ দিয়া যাবার ধইচ্ছোং, দেখলুং উমা অইন্য একজনক বইখাতাগিলা দিয়া দিল। মোক দিলে মুই ব্যাচে কিছু টাকা কামের পালুং হয়। মোক দেখিয়াও না দেখির ঢং করিল।কি আর কইম, মানষিগিলা ওমন এ, ঝোপ বুঝি কোপ ফ্যালায় আর তারপর দরকারের ব্যালাত নাই।
- ঠিক এ কইছেন।মোর ও একে অবস্থা, মানষিগিলা ক্যানে জানি দিন দিন পালে যায়ছে হাত থাকিয়া বুঝির এ পাং না।
লোকটা মৃদু হাসলো আর বললো
-খরিদ্দার আর কাছের মানষি সবগিলায় নসিব ওত নেখা থাকে বুঝিলু।হাম যেলা কাউশি ডেকাই, সবচেয়ে বেশি দাম দিয়া উমার ফ্যালে দেওয়া দামী জিনিষটা কিনির চাই।সস্তা ভাবে হামাক।তারপর মুখ ভ্যাঙচে অইন্যওঠে যায়া লোকসান করে। তেমনে হামরা যতই মানষিক বুঝাই, কাছত রাখির চেষ্টা করি, কোলা পিঠি করি মানষি করি। হাত বোলাই, আন্ধারত বাতি দেই। প্যালপ্যালা বাতাসোত উমা অইন্যঘরের সোহাগ করে। শ্যাষত সেই মানষিগিলায় থাকে, সেই খরিদ্দারগিলায়
গোরোত আইসে যেগিলা নসিবোত নেখা থাকে।
-সে ঠিক কিন্তু খরিদ্দার আর কাছের মানষি কি এক?
খরিদ্দার হারাইলে কষ্ট হয় না। কাছের মানষি ও কি তায়?
- মুই তো খরিদ্দার আর মানষিক এক করি দিছং। কাংয়ো সাথত থাকিল তায় লাভ, না থাকিল তায় লোকসান। আর ব্যবসাত লাভ লোকসান চৈলতে থাকে। খারাপ পায়া বসি থাকিলে দিনটায় নষ্ট হয়া যাইবে।
খাওয়া শেষ, শুভ মেসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল জীবনের কথা শোনাতে শোনাতে প্রত্যেকটা মানুষই বোধহয় এক একটি শিক্ষক হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ঢাল বেয়ে বেয়ে
সকাল থেকে অফিসে নানা ঝামেলা যাচ্ছিল। প্রোডাকশনের ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডাউন, কোন থার্ড পার্টি সার্ভিসের সাথে যুক্ত হওয়া যাচ্ছে না। হাউকাউ লেগে গেছে কাস্টোমারদের মাঝে। বাসা থেকে রিমোট কাজ করি। তাই একের পর এক কল আর মিটিং-এ যোগ দিতে হচ্ছে। এদিকে বাচ্চাটা জ্বরের কারণে আজকে ইশকুলে যায়নি বলে পাশের ঘরে খেলছে। একটু পর পর কোন একটা কারণে বারবার চিৎকার চেচামেচি করছে। প্রচণ্ড বিশৃংখল একটা পরিস্থিতি। এপার্টমেন্টের নিচে রাস্তায়ও বেশ হৈহল্লা শোনা যাচ্ছে।

চিরকুট
অনেক দিন পর রীয়াংশুর সাথে মৈনাকের দেখা হলো। রীয়াংশু মৈনাকের ছেলে বেলার বন্ধু।একসাথে স্কুল, কলেজ আড্ডার আসর,এভাবেই দুজনের বেড়ে ওঠা। রীয়াংশু ভালো স্টুডেন্ট হওয়ায় বর্তমানে ভারতীয় রেলে কর্মরত। মৈনাক বাপের ব্যবসা নিয়েই পড়ে রইলো ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুরে। অল্প বয়সে পেকে যাওয়ায় বিয়েটা অনেক আগেই সেরে ফেলেছে সে। রীয়াংশু সিঙ্গেল, এখনও তার চার হাত এক করার সুযোগ হয়নি।মাঝে মাঝে হাওয়া বদলের জন্য মৈনাক ,অল্প সময়ে ব্যস্ততার ফাঁকে রীয়াংশুর কাছে থেকে সপরিবারে ঘুরে আসে। এবারও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। লোটাকম্বল বগলদাবা করে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি হাজির হলো রীয়াংশুর বাসায়।

কালচিনির সুড়ঙ্গ
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ। ডুয়ার্সে তখন শীত নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিকেল নামলেই চা বাগানের সারি সারি ঝোপের ওপর কুয়াশা জমতে শুরু করে। দূরে বক্সার পাহাড় অন্ধকার হয়ে আসে, আর জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক। কালচিনির রাতের একটা নিজস্ব শব্দ আছে। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। পাতার ফাঁকে বাতাসের ঘর্ষণ।
এখনও কোনও মন্তব্য নেই
আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।