
‘ও সলেমান দাদা, এ্যাটা সিঙ্গারা খায়ে যাও’ – ডাক দিলো কানু।
‘এখন কিছু খামো না রে, বাড়িত যায়ে আগে গোসল করমো। তারপর তোর খাওয়ার চিন্তে।’ - বৃদ্ধ বয়সের সলেমান বললো।
‘গরম গরম সিঙ্গারা দাদা, এ্যাটা খাতে খাতে বাড়িত যাও’ – কানু আরেকবার সাধলো।
‘না রে, এ্যাটা কুত্তো আসে এমনভাবে গা ঘেঁষে গেলো, গোসল না করে আর কিছু উচপি নে। তুই খা তো। হামাক আর জেদ করিস নে।’
পাশে জমির ছিলো। সে হেসে বললো, ‘সলেমান দাদা এরকমই। অপরিষ্কার কিছু গায়ে লাগলে উনি আর খাবার-দাবার কিছু ছোঁবেন না। কুকুরের স্পর্শ যখন লেগেছে তাহলে তো আর কথায় নেই, গোসল করবেনই।’
কানু গরম গরম, দশ টাকায় পাঁচটা যে সিঙ্গারা পাওয়া যায় তার একটাতে কামড় দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বললো, ‘এরকম অভ্যাস অবশ্য হয় অনেকের।’
বাজারের এক পাশে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে তারা তাদের মত গল্প করতে লাগলো। আর দেখতে লাগলো, বিরক্ত মুখে হনহনিয়ে সলেমান দাদা বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে।
সলেমান মণ্ডল নামাবালা গ্রামের অতি বৃদ্ধদের একজন। তার বয়সের আর কে কে জীবিত আছেন, হিসাব করে বড়জোর সেরকম আর দুজনকে পাওয়া যাবে। এতো বয়স হলেও, চলছেন-ফিরছেন-নিজের কাজ করছেন, অন্য কারো উপর বোঝা না হয়ে। ঘরে দুজন মানুষ, যা প্রয়োজন তা নিজেই ব্যাবস্থা করে নিচ্ছেন। দুটো ঘর আছে বাড়িতে; একটা শোবার জন্য আর আরেকটায় ফসলাদি রাখার জন্য বস্তায় করে বা যেভাবে পারা যায়, সে ঘরেরই একটুখানি ফাঁকা জায়গায় দুই বুড়ো-বুড়ি বসে খাওয়ার কাজটি সারেন। সলেমান যখন বাড়ি ফিরলো হাতে ছোট ব্যাগটি নিয়ে, তখন রাশেদা ওই ঘরে বসেই ভাত খাচ্ছিলো।
বারান্দায় ব্যাগটি রেখে সলেমান বললো, ‘তোর টিপে টিপে ভাত খাওয়া দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়া যায়। খাওয়া কি আজ সারাদিনে শ্যাষ করবার পাবু?’
সলেমান মণ্ডলের বউ রাশেদা, হাতের থালাটি মেঝেতে রেখে ঝাঁঝিয়ে উঠলো, ‘ক্যা? টিপে টিপে খালে তোমার সমস্যা কী? আক্ষসের লাগান দুই গাসে এক থাল ভাত খায়ে কি আসমানের দিক চায়ে থাকমো? হামার সময়ও কাটান লাগবি।’
দাঁত কিড়মিড়িয়ে সলেমান উত্তর দিলো, ‘সময় কাটানোর জন্যি তোর এতো আস্তে আস্তে ভাত খাওয়া লাগবি? ধুঁয়োত যায়ে বাতাসের নিচে বসে থাকলেও তো সময় কাটপি। ঘরোত বসে ঘণ্টাধরে ভাত চাবাস!’
‘যার ব্যাথা তাই বোঝে। শরিল লিয়ে চলবের পাই নে, মাথাত নানা চিন্তে ঢিপি হয়ে আছে। আর কতা হলো, কবা যুগ পার হয়া গ্যালো সংসার করিচ্চি। খাচ্চিও ইংকে করেই। আজ মনে হয় নতুন দেকিচ্চো টিপে টিপে ভাত খাই হামি। হছে কি তোমার কও তো?’ – এক নিঃশ্বাসে সলেমানের সাথে পাল্লা দিয়ে বললো রাশেদা।
এই বয়সের অবস্থা সলেমানের তো না জানার কথা নয়। চুপ করে রইলো সে। এখন তার মুখ দেখে মনে হলো, আজ যেন সে কোথাও পেরে উঠছে না। মনটা খারাপ হয়ে গেলো, বউয়ের সাথে এতো প্যাঁচাল পারার কী দরকার ছিলো? অন্যদিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই তার কাজের কথাটি মনে পড়লো।
এতক্ষণের তর্কের কথা ভুলে গিয়ে বললো, ‘ও আশেদা, গামছা আর লুঙ্গিডা দেও তো।’
‘লুঙ্গি আবার কি করবা? সকালে নে একবার ডুব দিয়ে হাটোত গেলে।’ – নরম গলায় বললো রাশেদা।
‘গাওত ময়লা লাগছে। আরেকবার গোসল না করলে হবি নে।’
হাতে লুঙ্গি আর গামছা নিয়ে টিউবওয়েলের কাছে গেলো সলেমান। কল চেপে হাতে পানি নিলো। মুখে ছিটিয়ে দিলো, গড়গড়া করে কুলি করলো কিছুক্ষণ। তারপর চুপ হয়ে যেন ভাবতে লাগলো, কুকুরের স্পর্শ গায়ে লেগেছিলো বলে এই অবেলায় আবার গোসল করতে হচ্ছে। কিন্তু আজ তো দুটো কুকুর গায়ে লেগেছিলো!
দুটো কুকুর? কিছুক্ষণ আগের হাটের পুরো চিত্র তার মনের মধ্যে ভেসে উঠলো।
হাটবারে মানুষে মানুষে সব দিক সয়লাব থাকে। এ দোকান থেকে ও দোকানে যেতে ঠেলেঠুলে আগাতে হয়। আর এরকম মানুষের ভীর দেখলে, আশপাশের যত কুকুর তারাও ভীর করে। বাজারের কিছু নির্দিষ্ট কুকুর, যারা কিনা দিনরাত কাটায় এখানে ওখানে শুয়ে বসে, তারা তো এদিন বেশ নেতা হয়ে ওঠে; এমন যেন আজ কত দায়িত্ব! নতুন আসা কুকুরদের এরা দুচোখে দেখতে পারে না। চোখে পড়লেই তাড়া করে। এতো ভীরের মধ্যে এদের দৌড়াদৌড়িতে মানুষ কম বিরক্ত হয় না! কুকুরদের বাজার ছাড়া করতে লড়াই করে দু-চারজন দোকানদার মাত্র। তারা ছাড়া সকলেই হাটের কাজ শেষে দ্রুত বাড়িতে ফেরার জন্যই মরিয়া হয়ে থাকে।
মাছ-মাংসের দোকানের ওই অংশটায় অন্য অংশের চেয়ে একটু বেশিই ভীর। ওই টুকু পারও হতে হবে সরু গলির মত জায়গা দিয়ে। ওই গলিতেই একটা কুকুর অন্য কুকুরদের তাড়া খেয়ে দৌড়াতে লাগলো। আর সেই কুকুরটিই কিনা সলেমান মণ্ডলের একেবারে গায়ে এসে পড়লো। হেই, হেই, হুস; তাড়ানোর চেষ্টা করে লাভ হলো না। কুকুরটি গা ঘেঁষে চলে যাওয়ায় পাঞ্জাবীর অনেকখানি অংশে ময়লা লেগে গেলো, কাদামাটির অল্প ছাপ আর কুকুরের কিছু লোম। ভীষণ বিরক্ত হয়ে একটু ফাঁকায় এসে পাঞ্জাবীর ময়লা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলো সলেমান। তবুও তার মনে খচখচ করতে লাগলো। এখনি একবার গোসল সারতে পারলে ভালো হতো। তবে উপায় নেই, হাটের কাজ শেষ করেই তাকে বাড়ি ফিরে গোসলের কথা ভাবতে হবে। আপাতত যত দ্রুত পারা যায়, হাটের বাকী কেনাকাটা শেষ করা দরকার।
তার বাজার করার খুব বেশি অবশিষ্টও নেই। মাছ, সবজির সবই কেনা হয়েছে – বাকী রইলো তেল ও মসলা। সলেমান তেল-মসলার দোকানের সামনে দাঁড়ালো। হাফ লিটার সয়াবিন তেল, আর অল্প কিছু মসলা কিনতে হবে।
বেশি কেনার দরকার নেই একেবারে, বাড়িতে লোকই তারা মোটে দুইজন! সে কেবল দোকানদারকে দাম জিজ্ঞেস করেছে, তখনি কিনা কই থেকে এক বড়সড় লোক তাকে ঠেলে ঢুকে গেলো দোকানের একেবারে ভেতরে। লোকটার সাইজও যেমন বড়, বোঝাই যায় পকেটও কম বড় নয়। তার পিছনে আরেকজন একটি বড় ব্যাগ হাতে। লোকটি এমনভাবে ঠেলে ঢুকলো, সে যেন সলেমানের অস্তিত্ব খেয়ালই করলো না। গায়ে কিছুটা ধাক্কা খেয়ে একপাশে আপনিই সরে গেলো সলেমান কিংবা উড়ে গেলো, একটা ছোট প্যাঁচানো তুলোর দলায় ফুঁ দিলে যেমন হয়। সলেমান দোকানদারকে কিছু বলতে নিয়েছিলো, কিন্তু তার উপরে আগত লোকটি এমন সুরে আর হাত নেড়ে কথা বলতে লাগলো যে, দোকানদার এই বিশাল দাপুটে লোকটির দিকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলো। সলেমান তো তার বৃদ্ধ দেহ নিয়ে আগেই হারিয়ে গিয়েছিলো, এবার লোকটির চড়া সুরে তার সবটুকু অস্তিত্ব নিয়ে যেন একেবারে উধাও হয়ে গেলো। সলেমান যেন কোথাও নেই। মনে মনে রাগ কম হলো না সলেমানের আর ফলত যা হলো, সলেমানের মুখ থেকে ফিসফিসিয়ে বেড়িয়ে গেলো ‘শালা কুত্তো’।
সলেমান পরে অবশ্য ভাবলো এটা বলা কি ঠিক হলো? কিন্তু তবুও তার ওই স্বল্প বুদ্ধিতে মনে হলো, এর চেয়ে অন্য কোন উপযুক্ত সম্বোধন ওই লোকটির জন্য হয় না। আত্মসম্মানে আঘাত কিংবা ঈর্ষায় তার মন বিষিয়ে গেছে।
পাশে সে দাঁড়িয়ে রইলো একেবারে নির্জীব এক প্রাণী হয়ে। তা অসহায়ই বটে, দূর থেকে অন্য কেউ হয়ে সে নিজেকে দেখার চেষ্টা করলো। তাতে মনে হলো, কী হালকা আর মূল্যহীন! যার জন্য এসব, তাকে সে মনে ঠাঁই দিলো তার মত করেই ‘কুত্তো এ্যাটা’।
গোসলের সব আয়োজন যখন শেষ, গায়ে পানি ঢালবে সলেমান। তখন তার মনে পড়লো – সেই কোন কালে তার মা তাকে শিখিয়েছিলেন শরীরে কুকুরের স্পর্শ লাগলে গোসল করাই দরকার। যুক্তি নেই, তবুও সে শিক্ষা মন থেকে মুছে যায় নি।
তাই এখন গায়ে পানি দেবার আগে, তার মনে হলো – গোসল তো দিচ্ছি, কিন্তু কোন কুকুরের জন্য? আচ্ছা, মনে মনে ঠিক করে নিলো সে, কিছুটা শব্দ করেই বল
লো, ‘বড় কুত্তোটার জন্য’।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ঢাল বেয়ে বেয়ে
সকাল থেকে অফিসে নানা ঝামেলা যাচ্ছিল। প্রোডাকশনের ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডাউন, কোন থার্ড পার্টি সার্ভিসের সাথে যুক্ত হওয়া যাচ্ছে না। হাউকাউ লেগে গেছে কাস্টোমারদের মাঝে। বাসা থেকে রিমোট কাজ করি। তাই একের পর এক কল আর মিটিং-এ যোগ দিতে হচ্ছে। এদিকে বাচ্চাটা জ্বরের কারণে আজকে ইশকুলে যায়নি বলে পাশের ঘরে খেলছে। একটু পর পর কোন একটা কারণে বারবার চিৎকার চেচামেচি করছে। প্রচণ্ড বিশৃংখল একটা পরিস্থিতি। এপার্টমেন্টের নিচে রাস্তায়ও বেশ হৈহল্লা শোনা যাচ্ছে।

চিরকুট
অনেক দিন পর রীয়াংশুর সাথে মৈনাকের দেখা হলো। রীয়াংশু মৈনাকের ছেলে বেলার বন্ধু।একসাথে স্কুল, কলেজ আড্ডার আসর,এভাবেই দুজনের বেড়ে ওঠা। রীয়াংশু ভালো স্টুডেন্ট হওয়ায় বর্তমানে ভারতীয় রেলে কর্মরত। মৈনাক বাপের ব্যবসা নিয়েই পড়ে রইলো ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুরে। অল্প বয়সে পেকে যাওয়ায় বিয়েটা অনেক আগেই সেরে ফেলেছে সে। রীয়াংশু সিঙ্গেল, এখনও তার চার হাত এক করার সুযোগ হয়নি।মাঝে মাঝে হাওয়া বদলের জন্য মৈনাক ,অল্প সময়ে ব্যস্ততার ফাঁকে রীয়াংশুর কাছে থেকে সপরিবারে ঘুরে আসে। এবারও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। লোটাকম্বল বগলদাবা করে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি হাজির হলো রীয়াংশুর বাসায়।

কালচিনির সুড়ঙ্গ
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ। ডুয়ার্সে তখন শীত নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিকেল নামলেই চা বাগানের সারি সারি ঝোপের ওপর কুয়াশা জমতে শুরু করে। দূরে বক্সার পাহাড় অন্ধকার হয়ে আসে, আর জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক। কালচিনির রাতের একটা নিজস্ব শব্দ আছে। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। পাতার ফাঁকে বাতাসের ঘর্ষণ।
এখনও কোনও মন্তব্য নেই
আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।