ইমন কল্যাণ (৮ম পরিচ্ছেদ)

//৮ম পরিচ্ছেদ//
ট্রিপ থেকে ফেরার পথে অনেক কথাই মাথায় আসছিল। কী হবে না হবে। গরম খুব পড়েছে। খালি একটা গেঞ্জি গায়ে সেবক পার হচ্ছিল শহীদুল। পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছে। সাদিকদা খুব মনখোলা মানুষ। আর বউটা একটু চাপা। উদাস। মনের ভেতর কী চলছে বলা মুশকিল। স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম দেবা ন জানান্তি, কুতো মনূষ্য। কথাটা দেবোত্তমদার কাছে শোনা।
কত কি মাথায় আসে। এখন মনে হচ্ছে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দুটো কথা বলে। বড় মায়াময় মেয়েটির চোখ। টানা টানা। কালো। চুলের রং। শাড়ি পড়লে খুব সুন্দরী দেখায়। অন্যান্য ড্রেসেও। ওয়েল ড্রেস আপ। চোখে পড়ার মতো। দুর্দান্ত সুন্দরী। নামটাও অনন্য। ইমন। ইমন একটা রাগের নাম। শহীদুল জানে। বহুদিন ধরে সে কাওয়ালি, কাওয়ালি থেকে গজল, গজল থেকে হিন্দুস্তানী ক্লাসিকাল মিউজিক এক্সপ্লোর করেছে। প্রথমে বিরক্তি আসতো। তারপর আস্তে আস্তে সাইট গেছে। কত কত নাম। আমির খান। মল্লিকার্জুন মনসুর। শ্রুতি সাডোলিকর, কিশোরী আমনকর, ভীমসেন যোশী আমজাদ আলি খা, বড়ে গুলাম আলি, আমজাদ আলির দুই ছেলে আয়ান আর আমান আলি বঙ্গাশ। অন্যন্য। অনবদ্য।
মেয়েটির সম্পর্কে সে বেশি জানেনি। তবে ওর সুন্দর ক্লাসিফায়েড গলাটা কেমন যেন। গানের গলা যেমন হয়। প্রথমদিন সাদিকদার কল এসেছিল গাড়ি বুক করার জন্য। তারপর মাঝে দুয়েকবার মেয়েটি ফোন করেছিল। গলা শুনেই কেমন বুক কেঁপে উঠেছিল। মানুষ না ফেরেশতা? এত সুন্দর গলা। রাতে শোবার আগে মনে হয়েছিল ইসস্। যদি কেউ ভালোবেসে বলতো ভালোবাসি। এরকম গলার কেউ বলুক। সেই দিনটা না জানি কীরকম হবে।
মেয়েটাকে লুকিয়ে দেখছিল সে। গাড়িতে। কথা খুবই কম। চুপচাপ। তবে এটা কাটতে সময় লাগেনি। যখুনিই তারা বাঘপুলে এলো মেয়েটা যেন হয়ে উঠলো সরস্বতী।
জানেন শহীদুল আমি এর আগে কখনো পাহাড় দেখিনি।
তাই দিদিভাই?
হ্যাঁ। খুব ভালো লাগছে।
আপনার বাপের বাড়ি কোথায়।
মুখ থেকে হাওয়ায় উড়ে এসে পড়া চুল সরিয়ে ইমন উত্তর দেয় কামাখ্যাগুড়ি।
ও আচ্ছা। চিকলিগুড়ির ওদিকে?
হ্যাঁ।
ভালো জায়গা।
ভাই এদিকে কি আরও পাহাড় আছে?
হ্যাঁ। দার্জিলিং কুয়াশা আর বরফে ঢাকা। যদিও আমরা ওই রুটে যাব না। আমরা রংপোতে যাব প্রথমে। মাথা ঘুরতে পারে আপনার পারলে ঘুমিয়ে নেন। আমরা তো সকালে বেরিয়েছি। দু ঘন্টা পরে একটা হোটেলে ভাত পাওয়া যায় খেয়ে নেব।
না খিদে নেই। আসলে আমি চাইছি মনপ্রাণ দিয়ে পাহাড় দেখতে। জীবন কত ছোট পাহাড় না দেখলে বোঝা যায়না।
একদম।
গান চলছে।
তুঝে কিতনা চাহনে লাগে হাম।
বাত দিলকি নজরোনে কি, সচ কহেরাহ তেরি কসম
তেরে বিন আব না লেঙ্গে একভি দম
তুঝে কিতনা চাহনে লাগে হাম।
আসলে এই গানটা আমার খুব প্রিয়।
তাই?
হ্যাঁ। বহুবার শুনেছি।
মুভিটা ভালো না লাগলেও গানগুলো বেশ লাগে।
কী নাম মুভির?
কবীর সিং দিদিভাই।
ও আচ্ছা।
সবকটা গানই ভালো।
আচ্ছা। বোলপুরের ওখানে একটা সিনেমা হলে লাগিয়েছিল।
আপনি বোলপুর ঘুরতে গেছেন। মানে শান্তিনিকেতন?
না না আমি পড়তাম। ওখানে। বান্ধবীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে মুভি দেখতে যেতাম।
ও আচ্ছা।
আপনার কি সাব্জেক্ট ছিল?
মিউজিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত স্পেশালি, আর ক্লাসিক্যাল মিউজিকই।
আমাদের কিন্ত গান শোনাতে হবে।
আচ্ছা শোনাব।
গান আর শোনা হয়নি। ড্রপ করে দিয়েই শহীদুল চলে এসেছে। ওদের ধরিয়ে দিয়েছে আরেকটা গাড়ি। বাড়িতে বাবা অসুস্থ। হঠাৎই।
ফেরার সময় এতকিছু কেন মনে পড়ল বোঝা গেলনা।
শুধু আফসোস একটাই
তুমি এলে কিন্ত বড্ড দেরিতে হে স্বপ্নের রাজকুমারী। কিন্তু তুমিতো এখন কারো রানী।
আল্লাহ।
এখন কী করার।
কারো বউকে ভালোবাসা অপরাধ?
কিন্তু সে তো ভালোই বেসেছে। মুগ্ধ হয়েছে। সে তো কিছু চাইনি
ইমনের কাছে। তাহলে।
ভালোবাসাতো ইমানের অংশ।কিন্তু তাই বলে এভাবে। ছিঃ
নিজেকে চিনতে পারা যাচ্ছেনা।
পৃথিবীতে এত নারী। অথচ মন চলে গেল এক বিবাহিতা নারীর কাছে। তার পায়ের কাছে ঘুরঘুর করতে থাকে মন।
আত্মসমর্পণ করতে চায়।এ কী হলো?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দোষী মনে হয়। মনে হয় সে প্রথমবার কৌমার্য্য হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করছে। এটা অবৈধ তবুও তার বুকের ভেতর থেকে আওয়াজ আসছে ইমন কল্যাণ।।
ইমন কল্যাণ আলাদা থাকতে পারে?
জন্ম থেকেই তো তারা সঙ্গী।
সাদিক ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবছিল কতটা প্রাণখোলা আর মিশুকে মেয়ে ইমন। তবে একটা কথা ভেবে হাসিও পাচ্ছিল। শহীদুল আড়চোখে ইমনকে দেখছিল, সে দেখেছে। এই বয়সে সেও হয়ত এমনই ছিল। মেয়েদের দিকে তাকানোর অভ্যাস তারও আছে। আছে সকল পুরুষের। পরস্ত্রী হলেও। দুটো দিন ফাইন কেটে গেল। বাড়ি ফিরে ক্লান্ত লাগছিল। আজকেই ফেরা হলো। পাহাড় আর পাহাড়। নর্থবেঙ্গল ইউনিভার্সিটি থেকে সেও গিয়েছিল কারুর সঙ্গে। তারপর কত কী। স্মৃতি ভোলা যায়না। মানুষ স্মৃতির গোলাম। বিবির গোলাম নাহলে সে হয় স্মৃতির গোলাম। এতকিছু কেন মনে পড়ে সে জানেনা। যাকে সে পাবেনা কোনদিন তার কথা কেন মনে পড়ে? অতীত মানুষকে কেন বারবার অস্তিত্বের মুখে দাঁড় করায় মানুষকে? মানুষ চায় নির্ঝঞ্ঝাট একটা জীবন। আর যত সমস্যা বেঁচে থাকাকালীন। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার ইমন ক্রমেই ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসছে। পাহাড়ে যাওয়াটা জরুরি ছিল। একটা রিলিফ দরকার ছিল। পাহাড়ের প্রতি ওর টান দেখে মুগ্ধ হয়েছে সাদিক। প্রত্যেকটা মুহুর্ত অনুভব করেছে। উপভোগ করেছে। হয়তো অন্ধকার কেটে এভাবেই আলো আসে। ভালো আসে। এখুনিই সে কিছু ভাবছে না। বাবা মা চাইলেই সব হবে এমন নয়। বাবা মা'কে সে গুরুত্ব দেয়না এমন নয়। কিন্তু এটা তার আর ইমনের জীবন। নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভাবছে দুজনে। এখানে তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশ অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরঞ্চ নিষিদ্ধ। এই তাড়াহুড়ো করতে গিয়েই মানুষ জটিলতা টেনে আনে। হুটহাট সিদ্ধান্ত মানুষকে কী পরিমাণ বিপদে ফেলে তার প্রমাণ সে নিজে। আসলে অজ্ঞানতাই হয়তো রিলিফ। যে যত জানে সে তত কষ্ট পায়। গোপনে ইমনের বাড়ির লোক ব্যাপারটা মিটিয়ে নিলে হয়ত এমন হতোনা। কিন্তু পাঁচকান হওয়াতে ইমন যেন ঝিমিয়ে পড়েছিল। খুব স্বাভাবিক। কলঙ্কিত হতে কে চায়?
সাদিক জানে মা ইমনকে পছন্দ করেনা। কিন্তু তাদের কে বোঝায় যা হয়েছে হয়েছে। নতুন করে আর ঝামেলা বাড়ানোর পক্ষপাতী সাদিক নয়। সাদিক সুখ চায়। অনেকদিন একা একা জীবন কাটিয়ে সে ক্লান্ত। একটা মেয়ে মুহুর্তের ভুলে যে দুঃসহ সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে তাকে আর বাড়াতে চায়না। সে মানুষ। সে স্বামী। তার দায়িত্ব সে বোঝে।
নতুন শুরুয়াত নতুন সূর্য ওঠাটা জরুরি। সূর্য উঠবে। স্বাভাবিক কিন্তু রাতের অন্ধকারের ভেতরেও সেই আলোকে হৃদয়ে পুষতে হয়। সাদিক পেসিমিস্ট নয়। হতাশা সাদিকের ভেতর কাজ করেনা। সে চায় মানুষ ভালো থাকুক। আর নিজে ভালো না থাকলে মানুষকে কেউ ভালো রাখতে পারেনা।
ঘুমোবে না?
হ্যাঁ।
জল দাও মাথাব্যথা করছে।
আমারও।
আসলে কী হয়েছে বলো তো ইমন, পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে আমাদের মাথাও ঘুরছে।
ইমন হেসে ফেলে। প্রত্যুত্তরে বলে
আমার পাহাড় ঘোরার ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছে। জীবনে চেয়েছিলাম পাহাড় দেখি। ভাবছিলাম পাহাড়েই থেকে যাওয়া যায়না। কিন্তু কী করা যাবে ফিরতে হলো।
আবার যাব পুজোতে কী সমস্যা? স্কুলে ছুটে হলেই ছুটে যাব।
না আর পাহাড় নয়। এবার সমুদ্র। আমার খুব ইচ্ছে দীঘা যাওয়ার। বন্ধুরা মিলে যেতে চেয়েছিলাম যাওয়া হয়নি। তবে যাব। তুমি যখন বলছো।
তাই?
তুমি এতো ভালো কেন?
আমি আদৌ ভালো নই। সাদিক উত্তর দেয়।
হ্যাঁ। তুমি ভালো।
আচ্ছা। চলো আগামীকাল কামাখ্যাগুড়ি যাই?
ইমন কথা বলতে পারেনা। বাকরুদ্ধ হয়ে আসে। বেশকিছুদিন হলো সে বাপেরবড়ি যায়নি।ৎগেলে মায়ের এককথা।
তোকে মেনে নিয়েছে?
না যাবো না।
কেন?
ইমন অতীতে ফিরতে চায়না, শুধু এটুকু জেনে রাখো যে বাবা মা সন্তানকে বোঝা মনে করে, বিশেষত মেয়েদের, তারা বাবা মা হওয়া ডিজার্ভ করেনা। ওরা জানুক ওদের মেয়ে মরে গেছে।
এভাবে বলতে নেই।
তুমি মুড নষ্ট কোরো না। সাদিকের বুক ঘেঁষে আসে ইমন।
ইমন কখন সাদিকের হাতের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছে দেখে শান্তি পায় সাদিক। ঘুমন্ত নারীর থেকে পৃথিবীর আর কোনোকিছুই বেশি সুন্দর হতে পারে না।
পরবর্তী পরিচ্ছেদ (৯ম পরিচ্ছেদ) আগামী শনিবার (১৪/১১/২৬) তারিখে প্রকাশিত হবে।



এখনও কোনও মন্তব্য নেই
আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।