২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫
এক শীতের সকাল ও আমার মা
এক শীতের সকাল ও আমার মা

গল্প:- এক শীতের সকাল ও আমার মা

কলমে:- মোয়াল্লেম নাইয়া
    ~~~~~~০০~~~~~~
এই মধ্য বয়সে শীতের সকাল এলে কুয়াশায় মোড়া মনের বারান্দায় শৈশবের বহু স্মৃতি এসে ভিড় করে। যে স্মৃতির অনেকটা অংশ জুড়ে ঢেকে আছে বেদনার ধূসরতাl একা হয়ে যাওয়ার বিপন্নতাI ভাবতে গেলে সবকিছু কেমন যেন দুঃস্বপ্নের মতোই মনে হয়। এখনকার মতো তখনকার সকাল তো আর দেরিতে আসতো না! সূর্য ওঠার আগেই তার ঘুম ভেঙে যেত। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা এর কোন ব্যত্যয় ঘটতো না। তখন ছোট বড় সবাই পাখি ডাকার সাথে সাথে জেগে উঠতো। শিশির স্নাত দুর্বাঘাস মাড়িয়ে মেঠো পথ ধরে তারা ছড়িয়ে পড়তো নানান কাজে। সেই শৈশবের সকালে আমরা যখন লেপের তলায় আধো জেগে আধো ঘুমে, মা তখন চুপিসাড়ে আমাদের উষ্ণ আরামকে ব্যাঘাত না ঘটিয়ে সকালের শীত মেখে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন গৃহস্থালির কাজে । অন্যদিকে বাবা ছিলেন সম্পূর্ণ উদাসীন মানুষ। কচ্চিত কদাচিৎ তাঁর সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হতো। তবে সাক্ষাৎ হলে তিনি হাজার বছরের সুখ যেন একদিনেই মিটিয়ে দিতেনI সারাদিন আমাদের মতো হয়ে আমাদের সঙ্গে মিশে যেতেন। বোঝাই যেত না এই মানুষটাকে আমরা আমাদের জীবনে খুব কম পেয়েছি। তিনি কখন ফিরতেন কখন ঘুমাতেন, তা আমরা কেউ জানতেই পারতাম না। আমরা মানে আমাদের দুই ভাই ও বোন। আমি বড় হওয়ায় মাঝে মাঝে বাবাকে দেখেছি মধ্যরাতে ফিরতে, কখনো বা এক সপ্তাহ দু সপ্তাহ বাড়ির বাইরে কাটিয়ে দিতেI ঠাকুরদা অর্থাৎ আমার বাবার বাবা ছিলেন, ওই এলাকার এক বর্ধিষ্ণু ধনী ব্যক্তিI বাবা ছাড়া তাঁর বাকী চার ছেলে সবাই প্রতিষ্ঠিত I তাই তাঁর চোখে বাবা ছিলেন নিষ্কর্মা, ধ্বংসের প্রতীক। অথচ পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে বাবা নাকি ছিলেন সবচেয়ে তুখোড় বুদ্ধির অধিকারীI কিন্তু তিনি তাঁর সেই বুদ্ধিকে বৈষয়িক কাজে না লাগিয়ে পার্টি পাল্লা, মিটিং মিছিল, মানুষের দাবি-দাওয়া, তাঁদের সুখ দুঃখ ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করতেনI মায়ের মুখ থেকে শোনা, তিনি ছিলেন কোনো এক বামপন্থী দলের সদস্য। ঠাকুরদার ভাষায়, ছোটলোকের দল। যাদের ঘর নেই, দোর নেই, না খেতে পাওয়া, অশিক্ষিত হা-ভাতের দল। ফলে, ঠাকুরদার সংসারে বাবার মূল্য ছিল ভোজন শেষে ফেলে দেওয়া কলাপাতার মতো। আর আমরা তো জানি, প্রতিটি যৌথ পরিবারে বৌমার মূল্য নির্ধারিত হয় ছেলের মূল্যের উপর। স্বাভাবিকভাবে আমার মায়েরও মূল্য ছিল খুবই কমI তাই হয়তো সংসারের কাজের জন্য মাকে বিছানা ছেড়ে আগেই উঠে যেতে হতো। সব কাজ সেরে তিনি যখন আমাদের কাছে আসতেন তখনও শেষ রাতের অন্ধকার গাছে পালায় লেপটে থাকতোI আমরা ভাই-বোনেরা খুব অল্পতে সন্তুষ্ট ছিলামI তাই অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হলেও কখনো দুঃখ পাইনি বা বাবা মার প্রতি কোন অভিযোগ করিনিI বাবা প্রকাশ্যে মায়ের সঙ্গে খুব কম কথা বলতেন I তবে যতটুকু বলতেন, তাতে তাঁকে কখনো হাসতে দেখিনিI আমরা ঘুমিয়ে পড়লে হয়তো বাবা-মা কথা বলতেন। তাই বুঝতে পারতাম না তাদের মধ্যে সম্পর্কটা কেমন ছিল! হঠাৎ একদিন ঘুম ভেঙে বিস্ময়ে দেখি, মা নিঃশব্দে বাবার বুকে মাথা রেখে অবিরত কেঁদে চলেছেন। বাবা তখন মায়ের মাথায় হাত বোলাচ্ছেন আর বোঝাচ্ছেন, বেনু, তোমাকে খুব বেশি দূরে যেতে হবে না I একটু বাইরে তাকিয়ে দেখো, তোমার গ্রামের গরীব অসহায় মানুষগুলো এই শীতের রাতে কীভাবে এক বেলা আধ বেলা খেয়ে, না খেয়ে, জরাজীর্ণ ভাঙা কুঁড়েতে শীতকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে! তুমি বা তোমার ছেলে মেয়েরা তবু তো লেপ, কাঁথা জড়িয়ে শীতগুলো অতিক্রম করতে পারছ? বলতো, ওদের কী হবে! ওদের জন্য আমরা কী করতে পেরেছি? মা জবাব দিতে পারতেন না, শুধু নীরবে নিজের নির্ভরতার জায়গায় অশ্রু বিসর্জন করে ক্লান্ত হয়ে যেতেন। আমার ওইটুকু বয়সে বাবার প্রতি মাঝে মাঝে ভীষণ অভিমান হতোI মা বুঝতে পারতেন। আদর করে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন,তোর বাবার মতো বাবা এই পৃথিবীতে খুব কমই আছেন রে বাবু I আমি তখন মার দিকে তাকিয়ে বলতাম, মা এই সংসারে তোমাকে তো কেউ মূল্য দিল না। না বাবা, না দাদু, না জ্যেঠা-কাকা,কেউ নাI এমন কি জ্যেঠি কাকিরাও! তিনি ম্লান হেসে বলতেন, শত জন্মেও এমন স্বামী, এমন বাবা, এমন বন্ধু পাওয়া যায় নারে খোকাI আর বাকীদের কথা! তুই এখন বুঝবি না। একটু বড় হ I সেই সময় বুঝতে না পারলেও বাবার সঙ্গে যখন সাক্ষাৎ হতো তখন বুঝতাম, বাবা, কাকা জ্যেঠা বা অন্যদের থেকে হৃদয় অনুভূতিতে কতটা মহৎ, কতটা উদার! আমার বাবা যেন তাদের থেকে হাজার মাইল লম্বা এক মানুষ। কি অনাবিল হাসি! আমাদের জড়িয়ে ধরে যখন দু’গালে চুম্বন করতেন তখন এক অদ্ভুত মায়া যেন ঝরে পড়তো তাঁর দু’চোখ বেয়ে। তাঁর সেই ভূবন ভোলানো হাসি আর আন্তরিক উষ্ণতা, আহা! মন জুড়ে এখনো হাহাকার করে বেড়ায়। তবু কি আর এই সুখ চিরস্থায়ী হয়! জানি সব সুখ চিরস্থায়ী হয় না। কারণ সুখেরও বয়স বাড়ে তাই তার মৃত্যুও ঘটে। আমাদের সেই উষ্ণতা বিক্রি করা মায়ের জীবনে যতটুকু সুখ ছিল হঠাৎই এক শীতের সকাল এসে সেই সুখ এক নিমেষে কেড়ে নিল। 
         আমার বয়স তখন এগারোI বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ভোরে ওঠে পড়ছি। মা প্রত্যেক দিনের মতো বাড়ির কাজ করতে বাইরে বের হয়ে গেছেন। ভাই ও বোন তখনো ঘুমিয়ে। সেই হালকা আলো, হালকা আঁধারে মতিকাকা ওরফে আব্দুল মতিন I আমাদের বাড়িতে যিনি শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সারাবছর কাজ করতেন I সেই মতিকাকা উঠোনে দাঁড়ানো বড় বড় ধানের গাদার একটাতে মাথা ঠুকতে ঠুকতে আর্তনাদ করে উঠলেন, —“বড়বাবু, ছোটবাবু, সর্বনাশ হয়ে গেছে। মেজবাবু আর নেই! মেজবাবুকে কারা সুখচরের মাঠে মাডার করে চলে গেছে I” মতিকাকার সেই আর্তনাদে আমি চমকে উঠি,---মেজ বাবু! মানে আমার বাবা? একে একে বাড়ির বাইরে বের হয়ে এলেন আমার ঠাকুরদা, কাকা, জ্যেঠা সবাই। মা উঠোনে পাষাণ প্রতিমার মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। ঘরে ঘুমানো ভাই বোনের দিকে একবার তাকিয়ে আমি ছুটে গেলাম মার কাছে। তাঁর দু’হাত ধরে মুখের দিকে তাকাতেই তিনি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেনI তারপর শিশির সিক্ত সকালে সদ্য ধান উঠে যাওয়া নাড়া বাদা মাড়িয়ে মা আমাকে নিয়ে এগিয়ে চললেন সামনের দিকে I যেখানে আমার বাবা, আমার মায়ের প্রিয় মানুষ শুয়ে আছে সেই কৃষকের ঘামে ভেজা জমির দিকে I

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

কয়েকটি কবিতা
ওয়াহিদার হোসেন

কয়েকটি কবিতা

সকল দ্বিধা। ফেলে দিয়ে আস্তে আস্তে চলে আসি অন্ধকারে।এভাবেও ফেরা যায়।ফেরা কি সম্ভব?সাধুসঙ্গ টেনে আনে গার্হস্থের তুমুল আলোয়।দড়ি দড়া ছিড়ে ভেঙে পাখিও কি ফিরতে পারে পরিচিত শাখের জঠরে?

কবিতা৭ মে, ২০২৪
দুটি কবিতা
জ্যোতির্ময় বিশ্বাস

দুটি কবিতা

একা যে হাঁটছ যুবক এ বন পছন্দ বুঝি, ক'দিন এসেছ আগে শুনি বসো হেলান দিয়ে এই ফাল্গুনের ধ্বনি আর আগুনের পাশে বসে শুনি তোমার কথা সব

কবিতা৭ মে, ২০২৪
একটি স্নেহ চূড়া মৃত্যু .......
শ্রী সদ্যোজাত

একটি স্নেহ চূড়া মৃত্যু .......

ছেড়ে দেওয়ার পরেও কেমন যেন সে নয়ন আপন নয়ন হয়ে থাকে। কাছে থাকলে যদি অখিল স্রোতের বিড়ম্বনা আসে, একসময়ের পরিচিত একান্ত সংকেতগুলো হঠাৎ ঝড়ের মতন আবছা হয়ে আসে, ছেড়ে দেওয়ার পরেও সে কেমন একটা শিউলি শিউলি গন্ধ এই অবেলাতেও সারা গায়ে লেপ্টে রাখে,

কবিতা৭ মে, ২০২৪