
বাংলা নববর্ষ আমাদের সংস্কৃতিতে কীভাবে এল, এবং বাংলা পঞ্জিকা বা বাংলা বর্ষ ও মাস কী করে এল— এসব জানতে আমাদের সকলেরই ইচ্ছে করে। আসলে অজানাকে জানার আগ্রহ মানুষের চিরকালই ছিল এবং তা থাকবে।
অনেকের মতে মুঘল সম্রাট আকবরের হাত ধরেই বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে, ২৮ শে জানুয়ারি। সম্রাট আকবর তার রাজ্যাভিষেকের সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্য বিস্তার ঘটিয়েই চলেছিলেন। শুধুমাত্র রাজ্য বাড়ালেই তো আর হয় না, সেই সমস্ত জায়গা থেকে রাজস্ব আদায় করাটাও জরুরি হয়ে পড়ল । সেই সময় হিজরী ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হত। এই ক্যালেন্ডার আকাশে চাঁদের অবস্থান অর্থাৎ আকাশে পূর্ণিমা, অমাবস্যা এসবের হিসেবেই চলত। অন্যদিকে প্রজারা তো বেশিরভাগই কৃষক। এই কৃষি কাজে চাঁদের থেকে সূর্যের ভূমিকাই ঢের বেশি। আকাশে সূর্যের অবস্থান হিসেবে ঋতু পরিবর্তিত হয়ে থাকে। আর সেই মতে ক্ষেতে ফসল ফলে। কৃষকদের ফসল ফলার উপরেই তাদের কর দেওয়া নির্ভরশীল ছিল। তাছাড়াও চন্দ্র বছরে সূর্য অর্থাৎ সোলার ইয়ারের থেকে ১১ দিন কম থাকে। তাই ৩২ টা সোলার ইয়ার ৩৩ টা চন্দ্র বছরের সমান হয়ে যায়।
এসব নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হলো সম্রাট আকবরকে । সম্রাট আকবর তার রাজকীয় জ্যোতিবিজ্ঞানী ফতে উল্লাহ সিরাজ কে নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরির দায়িত্ব প্রদান করেন। এই বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও চিন্তাবিদ ফতে উল্লাহ সিরাজ হিজরী সন সৌর সিদ্ধান্ত নামে একটা জ্যোতিবিদ্যার বই অনুসারে এবং আকবরের সিংহাসনের আরোহনের বছরটিকে কেন্দ্র করে একটা নতুন সন তৈরি করেন আকবরের প্রবর্তিত ধর্ম দিন— ই —ইলাহীর সাথে মিলিয়ে এই ক্যালেন্ডারের নাম দেওয়া হয় তারিখ ই —ইলাহী।
প্রথমে এই নতুন সনের নাম দেওয়া হয় ফসলি সন, কেননা কৃষকদের কৃষি কর্মেও সুবিধার দিকে লক্ষ্য করে এই সন তৈরি করা হয়। পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা নববর্ষ রূপে প্রাধান্য লাভ করে। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ থেকে ১১ই মার্চ প্রথম বাংলা সন গণনা শুরু হয়। সম্রাট আকবরের সময় কাল থেকেই বাংলা নববর্ষের ১লা বৈশাখ শুরু হয়।
আমরা এতক্ষণ ধরে বাংলা নববর্ষ ও তার বর্ষপঞ্জি নিয়ে আলোচনা করলাম । কিন্তু এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয় যে, এই নববর্ষ অর্থাৎ নতুন সাল এতটা প্রাণের আবেগে ও গভীর ভালোবাসায় আমরা উদযাপন করি তার কারণ পাকিস্তান আমাদের পূর্ব বাংলার বাঙালিকে এই উৎসব পালন করতে রুদ্ধ করে। বলা হয়েছিল, এই উৎসব নাকি পাকিস্তানি আদর্শের পরিপন্থী। এর অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল বাঙালি সংস্কৃতির ওপর এক চরম আঘাত। বাঙালি তার সংস্কৃতির ওপর এই চরম আঘাত সহ্য করতে পারেনি, তারা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকল বাঙালির এই উৎসবকে জাতীয় ছুটির দিন ঘোষণার দাবিও বাঙ্গালিরা জানিয়েছিলেন কিন্তু এই দাবি অগ্রাহ্য হওয়ার ফলে বাঙালীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল এবং প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। এভাবে পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় বাঙালীর নববর্ষ এবং তার উদযাপনের আয়োজন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার সাধারন নির্বাচনে মুসলিম লীগ সরকারকে বিপুলভাবে পরাজিত করে যুক্ত ফ্রন্টের সরকার গঠিত হলে মুখ্যমন্ত্রী ও বাঙ্গালীদের জনপ্রিয় নেতা ফজলুল হক সরকার বাংলা নববর্ষের ছুটির দিন ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা ও আনন্দ জানান। সেটা ছিল বাঙালীর এক তাৎপর্যপূর্ণ বিজয়ের দিন, কিন্তু সেই বিজয় স্থায়ী হয়নি। যুক্ত ফ্রন্ট ভেঙ্গে দিয়ে এবং সামরিক শাসন জারি করে তা সামরিক ভাবে রুখে দিয়েছে স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকার। তবুও কিন্তু পূর্ব বাংলার বাঙালী পিছু হটেনি। সরকারিভাবে নববর্ষ পরবর্তীতে উদযাপিত না হলেও পাকিস্তানের আমলে কিন্তু বেসরকারিভাবে উদযাপিত হয়েছে প্রবল আগ্রহ ও গভীরতম উৎসাহ উদ্দীপনায়। এর মধ্যে সব থেকে সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ১৯৬১ সালে। ১৯৬৭ সালে পাকুর গাছের মূলে ছায়ানট নববর্ষের যে উৎসব শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় উন্মুক্ত পরিবেশে এখন তা জনগণের বিপুল উদ্দীপনায় দেশের সর্ববৃহৎ জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে ।
বাংলা সন চালু হওয়ার পর নববর্ষ উদযাপনে নানা আনুষ্ঠানিকতা যুক্ত হয়েছিল। নবাব এবং জমিদারেরা চালু করেন পূন্যাহ অনুষ্ঠান। ১লা বৈশাখে প্রজা বা কৃষকরা জমিদার তথা নবাবের বাড়িতে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হতেন তাদের মিষ্টিমুখ করা হতো এমন কি পান সুপারির আয়োজনও করা হত। এসব আয়োজন এর মূল উদ্দেশ্য ছিল খাজনা আদায়। মুর্শিদাবাদ ও বাংলার জমিদারদের মধ্যে এই অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল।
অন্যদিকে ব্যবসায়িক দোকানদাররা এই পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে 'হালখাতা' অনুষ্ঠানের প্রচলন করেছিলেন। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ তাই ফসলের মরসুমে ফসল বিক্রির টাকা হাতে না আসলে কৃষকসহ প্রায় কেউই নগদ টাকার মুখ দেখতে পেত না। ফলে সারা বছর বাকিতে প্রয়োজনীয় জিনিস না কিনে তাদের উপায় ছিল না। পহেলা বৈশাখের এই 'হালখাতা' অনুষ্ঠানে তারা দোকানদারদের বাকি বকেয়া টাকা মিটিয়ে দিতেন। দোকানদাররা তাদের জন্য মিষ্টি মুখের ব্যবস্থা করেন। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বাঙালিদের আরো একটি প্রধান উৎসব হল বৈশাখী মেলা। এই মেলা বৈশাখের প্রথম দিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি গ্রাম মিলিত হয়ে এই মেলার আয়োজন করা হত । এগুলির মধ্যে প্রাচীন ঠাকুরগাঁও গ্রামের রানী শংকৈল উপজেলার নেক মরদের মেলা এবং চট্টগ্রামের মহা মনির বৌদ্ধ পূর্ণিমা মেলা। একসময় এই মেলাগুলি খুব ধুমধামের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হত। সে মেলা এখনো বসে তবে আগের মত জৌলুস এখন আর নেই। কেননা এই মেলাগুলিতে বাঙালীর সংস্কৃতি লক্ষ্য করা যেত কিন্তু এখন এই মেলাগুলিতে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
পহেলা বৈশাখের এই উৎসব ও অনুষ্ঠানগুলি ছাড়া আরো অনেক ছোট বড় অনুষ্ঠান জড়িত রয়েছে এই নববর্ষ কে কেন্দ্র করে। এদের মধ্যে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত ''বলি'' খেলা বিশেষ উলে¬খযোগ্য। ১৯০৭ সাল থেকে কক্সবাজার সহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের নানা স্থানে এই খেলার প্রচলন আছে। এই বিখ্যাত কুস্তি খেলাকেই বলা হয় ''বলি'' খেলা। আব্দুল জব্বার নামক এক ব্যক্তি এই খেলার প্রবর্তন করেন বলে এই খেলাকে জব্বারের ''বলি'' খেলা নাম দেওয়া হয়েছিল। এই ''বলি'' খেলার পাশাপাশি নৌকা বাইচ, লাঠি খেলা, মোড়কের লড়াই প্রভৃতি ক্রিয়া প্রতিযোগিতার ও আয়োজন করা হতো।
সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রভাত সঙ্গীত গেয়ে এই নতুন বছরকে শিল্পীরা বরণ করে নিত এ প্রসঙ্গে অনেক শোভাযাত্রায় আবহমান বিষয় গ্রামীণ জীবন ও আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে উদ্যোগে এই শোভাযাত্রাটি বিশেষভাবে উলে¬খযোগ্য ভূমিকা পালন করে । ২০১৬ সালে ৩০ শে নভেম্বর এই মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর অক্সফোর্ডের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় বিশেষ স্থান পায়।
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে আধুনিককালের নব আঙ্গিকের বর্ষবরণ উৎসবের সূচনা হয় কলকাতার ঠাকুর পরিবারে। সেই ধারা ধীরে ধীরে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের নববর্ষ উৎসব ১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলনে পর নতুন গুরুত্ব ও তাৎপর্য লাভ করে । বাংলা একাডেমিতে বৈশাখী মেলা এবং গোটা বিশ্ববিদ্যালয় ও রমনা এলাকায় পহেলা বৈশাখের দিনে লক্ষ মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। নতুন পাজামা পাঞ্জাবি পরে ছেলেরা এবং নানা রঙের শাড়ি পড়ে মেয়েরা এই অনুষ্ঠানকে বর্ণিল করে তোলে। রবীন্দ্র সংগীত, নজরুলের গান, লোক সংগীত এবং বাঁশির সুরে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে সমবেত আকাল— বৃদ্ধ— বর্ণিতা । আনন্দময় ও সৌহাদ্যর্পূর্ণ এই পরিবেশ আধুনিক বাঙালী জীবনের এক গৌরবময় ইতিহাস।
বর্তমান কালে আমরা ব্যবহারিক জীবনে যদিও ইংরেজি বছর বা মাসকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। তাই বলে আমরা আমাদের বাংলা দিনপঞ্জীকে তাৎপর্যহীন বলে মনে করতে পারি না। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলাই যায় যে, ব্যবহারকারীর জীবনে যেমন আমাদের ইংরেজি মাস ও বছর হিসেবে চলতে হয় ঠিক তেমনি যে কোনো ধরনের মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান অর্থাৎ পূজা— আর্চনা, পৈতে, বিবাহ ও অন্নপ্রাশন প্রভৃতি অনুষ্ঠান কিন্তু কখনোই আমরা ইংরেজি দিনপঞ্জি হিসেবে করি না। এক্ষেত্রে আমরা আমাদের বাংলা দিনপঞ্জিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি। সেই দিক থেকে বিচার করলে কিন্তু পহেলা বৈশাখ বা নতুন বাংলা মাসকে আমাদের সকলেরই আনন্দ এবং উৎসাহের সহিত নিপুণভাবে পালন করা অবশ্যই কর্তব্য। তাই সবশেষে সকলকে শুভ নববর্ষের অগ্রিম প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই। নববর্ষ তথা নতুন বছর সকলেরই ভালো কাটুক । শুভ নববর্ষ।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট

Bug out of the bag-Expedition of Mt.Jagatsukh
August 29, 2022 we drove to the Duhangan Weir Site a.k.a Khanaul and started our trek from there. We met the guide, assistant guide and rest of the support team on the previous day, tested the equipment and discussed the further planning. A ride out of Manali is pompy on the street wind,the long site of mountains with pavements soon turning into gravels as views of the Himalayas are ahead coming to foreview.

প্রকৃতির টান ও শহুরে জীবন
পথ চলেছে পথের মতো ।পথিক হাঁটছে ,পথেই কি তবে পাবে পথিক দুদন্ড শান্তি।এমনি এক বিকেলে সূদূরের উদ্দেশ্য ভ্রাম্যমাণ পথিক দাঁড়িয়ে দেখে অসীম রহস্যময় অনন্ত বিস্তারিত জলরাশির মধ্যে আলো আঁধারি খেলা।গঙ্গাবক্ষের এমন সৌন্দর্য মুহূর্তের মধ্যে শহুরে জীবনে ক্লান্ত, ক্ষয়িষ্ণু চলমান পথিক কে টেনে নেয় তার কাছে। শেষ বিকেলের আলোয় ঢাকা সূর্যাস্ত, নদীর কলতান, ভাসমান নৌকা,ছায়া নিবিড় সুশীতল স্নিগ্ধ প্রকৃতির রুপ,বিগত অনাগত কত ভাবনার মধ্যে মনকে গ্ৰাস করে।কি চাইলাম ,কি চেয়েছি কোথায় যাচ্ছি মুহূর্তের মধ্যে নিজের মনের মানুষের সন্ধানে খুঁজে ফেরে পথিক।

ল্যাংস্টন হিউজ (আমেরিকান কবি-লেখক ও সমাজকর্মী)
ল্যাংস্টন হিউজ লিংকন বিশ্ববিদ্যালয়, পেন্সিল্ভেনিয়ায় পড়শুনা করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্লেম রেনেসাঁসের অন্যতম একজন নেতা। তাঁর কর্মকাল ছিল ১৯২৬ সাল থেকে–১৯৬৪ সাল পর্যন্ত।
এখনও কোনও মন্তব্য নেই
আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।