৩ মার্চ, ২০২৫
অন্তঃপুরের মেয়ে
অন্তঃপুরের মেয়ে
        প্রথম পর্ব

শ্রাবনের আকাশে রোদ;বৃষ্টির গল্প তখন , দক্ষিণের বারান্দাটা ওর নিজস্ব,  এখানে অনেক রকমের শৌখিন ফুলের গাছ সুন্দর সুন্দর  টবে লাগিয়েছে ও নিজে হাতে , ফুল গাছের খুব শখ ওর,এছাড়া  বারান্দার এক কোণে বড় খাঁচায় নানান ধরনের পাখি রেখেছে ।তবে ,পাখিদের বন্দী করে রাখতে ওর ভাল লাগে না, তাই নানান ধরনের পাখি এনে কিছুদিন রেখে মুক্ত আকাশে ছেড়ে দেয় , বড়ো ছেলে সুমন্ত  এই জন্যে নানান ধরনের পাখি অর্ডার করে নিয়ে আসে মায়ের মুখে হাসিটুকু দেখার জন্যে । আজ স্বর্ণর শরীরটা ভাল নেই, হেঁসেল বড় বউমা'র দায়িত্বে । ক'দিন থেকে রাত জেগে  আশাপূর্ণা দেবীর 'সুবর্ণলতা' পড়া শুরু করেছে   , আজ শেষ করবে বলে পড়ন্ত রোদের আলোয় মাদুড় পেতে কোল বালিশে হেলান দিয়ে বই' টা পড়ছিল, এ কথা  শাশুড়ি মায়ের কানে দিয়ে আসে মন্দা । আজকাল বড় বউমা'র জন্যে মন খারাপ হয় মনোরমা দেবীর । তাই চুপ করে থাকেন, উল্টে মন্দা'কে  বকা দেন, 'ও পড়তে জানে ,সাহিত্য ভালবাসে তাই পড়ছে,সব কথা আগের মতো আমাকে বলবিনে।'
সেই চোদ্দ বছর বয়সে স্বর্ণ'কে বউ করে ঘরে নিয়ে আসে 
অসীমের প্রথম বউ গত হওয়ার পর , তারপর সংসার ও আগের পক্ষের নাবালক তিন ছেলে-মেয়ের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল ওতটুকু মেয়ের হাতে ।তারপর  থেকে অন্তঃপুরের সব দায়িত্ব স্বর্ণলতার ।

         দ্বিতীয় পর্ব 

সকাল থেকে সন্ধ্যা একান্নবর্তী পরিবারে  অন্তঃপুরের  হেঁসেলে দিন কাটে স্বর্ণ''র।বাড়ির কর্তাদের অফিসের রান্না থেকে রাতের রান্না তারই দায়িত্বে , সবটাই হাসিমুখে করত কখনও রাগ করে কারও সাথে কথা বলেনি। আগের পক্ষের সন্তানদের নিজের সন্তানের মতোই মানুষ করেছে । '' ঈশ্বর তিন সন্তান আমার কোলে দিয়েছে সত্যিই আমি ভাগ্যবতী।"মাঝে মাঝেই সবাইকে একথা বলতেন, কেউ ওর মা না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে । 
কোন রান্নায় কী ফোড়ন দিতে হবে, নুন;মিষ্টির পরিমাপ সবটাই শাশুড়ি মা নিজে হাতে শিখিয়েছে ওকে । আজ পরিপক্ক গিন্নী স্বর্ণ, বড় ছেলেকে বিয়ে দিয়েছে , বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে  মেয়ের পছন্দের ডাক্তার 
ছেলের সাথে , ছোট মেয়ে সিমন্তনী (সিমূ)
কলেজে পড়ছে বাঙলা সাহিত্যে অনার্স নিয়ে । অসীম বাবু কলেজে পড়ান , মাঝে মাঝে স্বর্ণের পড়ার জন্যে বই নিয়ে  আসতেন লাইব্রেরি থেকে সে পড়তে ভালবাসে বলে , এতটুকুই আনন্দ ছিল স্বর্ণের জীবনে ।

           তৃতীয় পর্ব 

স্কুলের গন্ডী পেড়িয়ে কলেজে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল স্বর্ণর, কিন্ত পরিবারের আর্থিক অবস্থার টানাপোড়েনের কারণে , বড় ঘর দেখে মেয়ে দিয়ে দেন সুকুমার বাবু ,কোন কিছুতেই আপত্তি করেননি , 'সোনার আংটি , আর এমন ঘর পাওয়া যায়!'  বাবা-মায়ের কথাই শেষ কথা । সব ইচ্ছেগুলোকে বিসর্জন দিয়ে দেয় স্বর্ণ। শুধু লুকিয়ে শেষ চিঠি লেখে রমেন বাবুর কাছে, 
তখন সে ছিল বেকার, 
তাই স্বর্ণ'কে নিজের করতে পারেনি । কিছু করার ছিল না তার,  শুধু বলেছিল 'সুখী হও স্বর্ণ।'

           চতুর্থ পর্ব 

আজকাল স্বর্ণলতা প্রায়ই অসুস্থ থাকে , অসীম বাবু বলেছেন ছুটি পেলে হাওয়া বদল করতে নিয়ে যাবেন । পুজোর আর দু-মাস । সীমন্তিনী'র পরীক্ষা পুজোর পর,সব হিসেব করে রেখেছে। মনোরমা দেবীর মন ভাল নেই, যতই বকা দিয়েছেন, কিন্ত কখন যে স্বর্ণ বউ থেকে মেয়ে হয়ে  উঠেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতেও পারেনি । 
         আজ স্বর্ণর শরীর ভাল নেই নিজের ঘরে শুয়ে আছে । 
শাশুড়ি মা চুপচাপ ঘরে ঢুকে মাথায় হাত রাখে ' মা, এসেছেন বুঝি ? এবার পুজোয় মায়ের অষ্টমীর ভোগে কী কী রান্না হবে? দশমীর সিঁদুর খেলায় সুমনা(বড় মেয়ে) থাকবে , পুজোর ক'দিন এখানেই থাকবে ' স্বর্ণ আপন মনে বলতে থাকে । ' ঠিক আছে মা, তোমার যা মনে হবে ,তাই করবে ,এখন একটু ঘুমোও আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেই ।'

         পঞ্চম পর্ব 

অষ্টমী পুজোর অঞ্জলী দেওয়া শেষ হয়েছে ,মায়ের সন্ধী পুজাও শেষ হয়ে গিয়েছে ,সন্ধ্যারতি চলছে । এদিকে স্বর্ণের ঘরে ডাক্তার,  শেষ জবাব দিয়ে গিয়েছেন,  'আজ রাতটা !দেখুন যায় কী না!' অসীম বাবু প্রথম পক্ষের স্ত্রীর মতো ভালবাসেনি স্বর্ণ'কে তবে ভালবাসতেন , ওর ভাললাগা সবকিছু এনে দিতেন,  যেমন বই,বেল ফুল,  রসগোল্লা খুব ভালবাসত  ও । বড় মেয়ে মায়ের পায়ের কাছে চোখে জল , অসীম বাবু বলেই চলছে ' ছুটি তো হয়েই গেছে স্বর্ণ,  তবে কেন অভিমান করে চলে যাচ্ছ ?'  
..................' মা, এবার আমার সব দায়িত্ব আবার তোমার হাতে তুলে দিলাম,  .......তোমার মেয়েকে ক্ষমা কর কোন ভুল করে থাকলে এজীবনে ' স্বর্ণ'র শেষ কথা ।............

চোখের দু'কোণে জল গড়িয়ে পরে , চোখের পাতা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় । অষ্টমী তিথি পাড় করে নবমিতেই বিসর্জন হয় মুখুজ্যে বাড়ির দেবী দুর্গার ।।

এখনও কোনও মন্তব্য নেই

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ঢাল বেয়ে বেয়ে
আহসানুল করিম

ঢাল বেয়ে বেয়ে

সকাল থেকে অফিসে নানা ঝামেলা যাচ্ছিল। প্রোডাকশনের ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডাউন, কোন থার্ড পার্টি সার্ভিসের সাথে যুক্ত হওয়া যাচ্ছে না। হাউকাউ লেগে গেছে কাস্টোমারদের মাঝে। বাসা থেকে রিমোট কাজ করি। তাই একের পর এক কল আর মিটিং-এ যোগ দিতে হচ্ছে। এদিকে বাচ্চাটা জ্বরের কারণে আজকে ইশকুলে যায়নি বলে পাশের ঘরে খেলছে। একটু পর পর কোন একটা কারণে বারবার চিৎকার চেচামেচি করছে। প্রচণ্ড বিশৃংখল একটা পরিস্থিতি। এপার্টমেন্টের নিচে রাস্তায়ও বেশ হৈহল্লা শোনা যাচ্ছে।

গল্প১৪ অক্টোবর, ২০২৬
চিরকুট
মিঠুন মণ্ডল

চিরকুট

অনেক দিন পর রীয়াংশুর সাথে মৈনাকের দেখা হলো। রীয়াংশু মৈনাকের ছেলে বেলার বন্ধু।একসাথে স্কুল, কলেজ আড্ডার আসর,এভাবেই দুজনের বেড়ে ওঠা। রীয়াংশু ভালো স্টুডেন্ট হওয়ায় বর্তমানে ভারতীয় রেলে কর্মরত। মৈনাক বাপের ব্যবসা নিয়েই পড়ে রইলো ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুরে। অল্প বয়সে পেকে যাওয়ায় বিয়েটা অনেক আগেই সেরে ফেলেছে সে। রীয়াংশু সিঙ্গেল, এখনও তার চার হাত এক করার সুযোগ হয়নি।মাঝে মাঝে হাওয়া বদলের জন্য মৈনাক ,অল্প সময়ে ব্যস্ততার ফাঁকে রীয়াংশুর কাছে থেকে সপরিবারে ঘুরে আসে। এবারও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। লোটাকম্বল বগলদাবা করে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি হাজির হলো রীয়াংশুর বাসায়।

গল্প১৩ অক্টোবর, ২০২৬
কালচিনির সুড়ঙ্গ
মোফাজ্জল মণ্ডল

কালচিনির সুড়ঙ্গ

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ। ডুয়ার্সে তখন শীত নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিকেল নামলেই চা বাগানের সারি সারি ঝোপের ওপর কুয়াশা জমতে শুরু করে। দূরে বক্সার পাহাড় অন্ধকার হয়ে আসে, আর জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক। কালচিনির রাতের একটা নিজস্ব শব্দ আছে। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। পাতার ফাঁকে বাতাসের ঘর্ষণ।

গল্প১৩ অক্টোবর, ২০২৬