প্রথম পর্ব
শ্রাবনের আকাশে রোদ;বৃষ্টির গল্প তখন , দক্ষিণের বারান্দাটা ওর নিজস্ব, এখানে অনেক রকমের শৌখিন ফুলের গাছ সুন্দর সুন্দর টবে লাগিয়েছে ও নিজে হাতে , ফুল গাছের খুব শখ ওর,এছাড়া বারান্দার এক কোণে বড় খাঁচায় নানান ধরনের পাখি রেখেছে ।তবে ,পাখিদের বন্দী করে রাখতে ওর ভাল লাগে না, তাই নানান ধরনের পাখি এনে কিছুদিন রেখে মুক্ত আকাশে ছেড়ে দেয় , বড়ো ছেলে সুমন্ত এই জন্যে নানান ধরনের পাখি অর্ডার করে নিয়ে আসে মায়ের মুখে হাসিটুকু দেখার জন্যে । আজ স্বর্ণর শরীরটা ভাল নেই, হেঁসেল বড় বউমা'র দায়িত্বে । ক'দিন থেকে রাত জেগে আশাপূর্ণা দেবীর 'সুবর্ণলতা' পড়া শুরু করেছে , আজ শেষ করবে বলে পড়ন্ত রোদের আলোয় মাদুড় পেতে কোল বালিশে হেলান দিয়ে বই' টা পড়ছিল, এ কথা শাশুড়ি মায়ের কানে দিয়ে আসে মন্দা । আজকাল বড় বউমা'র জন্যে মন খারাপ হয় মনোরমা দেবীর । তাই চুপ করে থাকেন, উল্টে মন্দা'কে বকা দেন, 'ও পড়তে জানে ,সাহিত্য ভালবাসে তাই পড়ছে,সব কথা আগের মতো আমাকে বলবিনে।'
সেই চোদ্দ বছর বয়সে স্বর্ণ'কে বউ করে ঘরে নিয়ে আসে
অসীমের প্রথম বউ গত হওয়ার পর , তারপর সংসার ও আগের পক্ষের নাবালক তিন ছেলে-মেয়ের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল ওতটুকু মেয়ের হাতে ।তারপর থেকে অন্তঃপুরের সব দায়িত্ব স্বর্ণলতার ।
দ্বিতীয় পর্ব
সকাল থেকে সন্ধ্যা একান্নবর্তী পরিবারে অন্তঃপুরের হেঁসেলে দিন কাটে স্বর্ণ''র।বাড়ির কর্তাদের অফিসের রান্না থেকে রাতের রান্না তারই দায়িত্বে , সবটাই হাসিমুখে করত কখনও রাগ করে কারও সাথে কথা বলেনি। আগের পক্ষের সন্তানদের নিজের সন্তানের মতোই মানুষ করেছে । '' ঈশ্বর তিন সন্তান আমার কোলে দিয়েছে সত্যিই আমি ভাগ্যবতী।"মাঝে মাঝেই সবাইকে একথা বলতেন, কেউ ওর মা না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ।
কোন রান্নায় কী ফোড়ন দিতে হবে, নুন;মিষ্টির পরিমাপ সবটাই শাশুড়ি মা নিজে হাতে শিখিয়েছে ওকে । আজ পরিপক্ক গিন্নী স্বর্ণ, বড় ছেলেকে বিয়ে দিয়েছে , বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে মেয়ের পছন্দের ডাক্তার
ছেলের সাথে , ছোট মেয়ে সিমন্তনী (সিমূ)
কলেজে পড়ছে বাঙলা সাহিত্যে অনার্স নিয়ে । অসীম বাবু কলেজে পড়ান , মাঝে মাঝে স্বর্ণের পড়ার জন্যে বই নিয়ে আসতেন লাইব্রেরি থেকে সে পড়তে ভালবাসে বলে , এতটুকুই আনন্দ ছিল স্বর্ণের জীবনে ।
তৃতীয় পর্ব
স্কুলের গন্ডী পেড়িয়ে কলেজে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল স্বর্ণর, কিন্ত পরিবারের আর্থিক অবস্থার টানাপোড়েনের কারণে , বড় ঘর দেখে মেয়ে দিয়ে দেন সুকুমার বাবু ,কোন কিছুতেই আপত্তি করেননি , 'সোনার আংটি , আর এমন ঘর পাওয়া যায়!' বাবা-মায়ের কথাই শেষ কথা । সব ইচ্ছেগুলোকে বিসর্জন দিয়ে দেয় স্বর্ণ। শুধু লুকিয়ে শেষ চিঠি লেখে রমেন বাবুর কাছে,
তখন সে ছিল বেকার,
তাই স্বর্ণ'কে নিজের করতে পারেনি । কিছু করার ছিল না তার, শুধু বলেছিল 'সুখী হও স্বর্ণ।'
চতুর্থ পর্ব
আজকাল স্বর্ণলতা প্রায়ই অসুস্থ থাকে , অসীম বাবু বলেছেন ছুটি পেলে হাওয়া বদল করতে নিয়ে যাবেন । পুজোর আর দু-মাস । সীমন্তিনী'র পরীক্ষা পুজোর পর,সব হিসেব করে রেখেছে। মনোরমা দেবীর মন ভাল নেই, যতই বকা দিয়েছেন, কিন্ত কখন যে স্বর্ণ বউ থেকে মেয়ে হয়ে উঠেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতেও পারেনি ।
আজ স্বর্ণর শরীর ভাল নেই নিজের ঘরে শুয়ে আছে ।
শাশুড়ি মা চুপচাপ ঘরে ঢুকে মাথায় হাত রাখে ' মা, এসেছেন বুঝি ? এবার পুজোয় মায়ের অষ্টমীর ভোগে কী কী রান্না হবে? দশমীর সিঁদুর খেলায় সুমনা(বড় মেয়ে) থাকবে , পুজোর ক'দিন এখানেই থাকবে ' স্বর্ণ আপন মনে বলতে থাকে । ' ঠিক আছে মা, তোমার যা মনে হবে ,তাই করবে ,এখন একটু ঘুমোও আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেই ।'
পঞ্চম পর্ব
অষ্টমী পুজোর অঞ্জলী দেওয়া শেষ হয়েছে ,মায়ের সন্ধী পুজাও শেষ হয়ে গিয়েছে ,সন্ধ্যারতি চলছে । এদিকে স্বর্ণের ঘরে ডাক্তার, শেষ জবাব দিয়ে গিয়েছেন, 'আজ রাতটা !দেখুন যায় কী না!' অসীম বাবু প্রথম পক্ষের স্ত্রীর মতো ভালবাসেনি স্বর্ণ'কে তবে ভালবাসতেন , ওর ভাললাগা সবকিছু এনে দিতেন, যেমন বই,বেল ফুল, রসগোল্লা খুব ভালবাসত ও । বড় মেয়ে মায়ের পায়ের কাছে চোখে জল , অসীম বাবু বলেই চলছে ' ছুটি তো হয়েই গেছে স্বর্ণ, তবে কেন অভিমান করে চলে যাচ্ছ ?'
..................' মা, এবার আমার সব দায়িত্ব আবার তোমার হাতে তুলে দিলাম, .......তোমার মেয়েকে ক্ষমা কর কোন ভুল করে থাকলে এজীবনে ' স্বর্ণ'র শেষ কথা ।............
চোখের দু'কোণে জল গড়িয়ে পরে , চোখের পাতা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় । অষ্টমী তিথি পাড় করে নবমিতেই বিসর্জন হয় মুখুজ্যে বাড়ির দেবী দুর্গার ।।