৩০ নভেম্বর, ২০২৫
অক্ষরেরা ফিরে এসেছে
অক্ষরেরা ফিরে এসেছে

একসময় বঙ্গগাঁও বলে এই শহরটি জুড়ে ছড়িয়ে ছিল বাংলা হরফের মেলা, সাহিত্যের সম্ভার। কত বড় বড় গুণীজনেরা দূর দূর থেকে আসতেন বই ছাপাতে। বইয়ের দোকানে ভিড় জমাতেন, দেওয়ালে আঁকা থাকতো কবিদের নাম ও কবিতা। বিকেল হতে না হতেই স্থানীয় লোকজনেরাও গল্পের ঠেক বসাতেন, উৎসবের দিনগুলোতে পত্রিকা সম্পাদিত হতো, হতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান – এছাড়াও আরো কত কি! সেই কত কি না ছিল সেই দিনগুলোতে!!! 

 

কিন্তু এখন?

 

রাস্তার সাইনবোর্ডগুলোতে এখন ইংরেজিতে লেখা। দেওয়ালে সব ইংরেজি বক্তৃতা। বাড়িগুলোর নামেও আজ আর বাংলা অক্ষর হয়েছে দুর্লভ। এমনকি শিশুরাও স্পষ্ট করে কথা শেখার আগেই অপক্কো স্বরে “হাই-হ্যালো” বলে অভ্যর্থনা জানায়। 

 

কাকিমা, জ্যেঠিমা, রাঙ্গামা, মাসিমা, মামীমা সেই কতোই না মিষ্টি ডাক ছিল! আজ সব বদলে গিয়ে সেগুলো পরিবর্তিত হতে হতে “আন্টি”ই সর্বশ্রেষ্ঠ হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও আজ বাঙ্গালীর মুখে ‘রাবীন্দ্রানাথ টেগরে’ই বেশি প্রচলিত। এই সব কিছু দেখতে দেখতে বয়স যখন প্রায় একাশীর দুয়ারে, বৃদ্ধ অক্ষয়বাবু তখন শুধু তার পুরাতন বাংলা মুদ্রণালয়ের এক কোণে বসে। তাঁর দোকান “বাংলার আলো” একসময় সাহিত্য পত্রিকার ছাপাখানা ছিল। এখনও সেই রকমটাই আছে। তবে ধুলো, বই ভক্ষক পোকাদের আমদানী হয়েছে। কিছু স্মৃতি হয়ে থাকা বই আর সেই পুরাতন আসবাসপত্র আজ ভিড় জমিয়েছে সেইখানে। অক্ষরগুলো একে একে মরচে পড়ে নিঃশেষের পথে।

 

একদিন এক জোড়া তরুণ ছেলেমেয়ে আসে সেই পুরাতন দোকানে। নাম অর্জুন ও মিষ্টি। তারা শহরের ডিজিটাল ম্যাগাজিন চালায়, নাম ইয়ং ফেস।

— “দাদু, আমরা একটা প্রজেক্ট করছি। বিষয় Lost Languages। ভাবলাম আপনার পুরানো প্রেসটার কিছু ছবি নেব।”

 

ডিজিটালের স্পর্শহীন দোকানটির ভিতর থেকে অক্ষয়বাবু মৃদু হেসে বললেন,

— “ছবি তো নেবে, কিন্তু অক্ষরগুলো কি চিনবে? আজ তো আর কেউ আসে না তাই আর কি।”

 

অর্জুন মজা করে বলল, “চিনব না আবার! সেই তো বাংলা অক্ষর। ল্যাটিন বা অন্য বিদেশি ভাষা তো আর নয়। কিন্তু এখন তো এগুলো ইউজ হয় না দাদু। সবাই এখন ডিজিটাল, মর্ডান। ইংলিশে অনলাইনে লেখে।”

 

অক্ষয়বাবুর চোখে এক ধরনের বিষণ্ণতার আলো জ্বলে ওঠে। নাম জিজ্ঞেস করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মৃদু হেঁসে মাথা নীচু করে থাকলেন। তারা চলে গেলো।

 

সময় তার নিয়ম মেনে এগোতে থাকলো কিন্তু “সেই তো বাংলা অক্ষর।” এই কথাটি বারংবার অক্ষয়বাবুর হৃদয়ে আঘাত হানছিল। তিনি ভাবলেন, “lost language নিয়ে তাদের কাজ। নামটিও তার অর্জুন। আর ভাষাও তার বাংলা অথচ নিজের ভাষায় প্রতি তার কতটা তাচ্ছিল্যতা। নিজের মাতৃ ভাষা অর্থাৎ নিজের মা’কে অবহেলা করে কি অন্যের মা’কে ভালোবাসা যায়? যেদিন মানুষ নিজের অক্ষর চিনবে না, সেদিন মানুষ নিজের শিকড় কি করে আঁকড়ে ধরবে? শিকড় যে হারাবে। তারা ছবি তুলল বটে। তবে তা স্বার্থে, আপনত্বে নয়। ছবি হয়েই থেকে যাবে কোনো এক কোণে।” 

 

ওপর দিকে সেই রাতে মিষ্টি কিন্তু ঘুমোতে পারল না। তার মনে হতে লাগলো, এই শহরের আলো যেন ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। অক্ষরগুলো নিঃশব্দে কাঁদছে। যা নিজের ছিল তা অচেনার ভিড় হারিয়ে যাচ্ছে। 

 

পরদিন মিষ্টি আবার গেল সেই প্রেসে। অক্ষরবাবু আছেন। সামনে একটা পুরাতন হাতছাপা বই। নাম “বাংলা, সমাজ ও সংস্কৃতি”। পাতাগুলোতে সময়ের ভার স্পষ্ট। ধুলোয় ভরা। কিন্তু অক্ষরগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ধুলোর ভিতর থেকে উজ্জ্বল হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। যেন তারা বলছে ‘আমরাই তো অস্তিত্ব, কেবল তাদের আপন করে নেওয়ার পালা।’ 

 

মিষ্টি তার ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করে বইটা মুছে নিলো।

— “দাদু, আমি কি এই বইটা স্ক্যান করে অনলাইনে দিতে পারি? যেন সবাই পড়তে পারে, বুঝতে পারে আমাদের ঐতিহ্যকে এবং জানতে পারে আমরা কী হারাচ্ছি।”

 

মাথা নীচু করে বসে থাকা অক্ষয়বাবু কথাগুলো শুনে যেন চমকে গেলেন। যেন কোনো পরশ পাথরের স্পর্শ পেলেন। নিজেকে সংবরণ করে হাসলেন। বললেন, 

— “এটাই তো চেয়েছিলাম রে মা। অস্তিত্বের সংকটকালে অন্তত একজন যদি জয়ের প্রদীপ জ্বালায়, তাতেই যে আকাশ সমান ভরসা। ভাষার আলো নিভে গেলে যে ২১শের মাহাত্ম্য ব্যার্থ হবে। কেউ যদি একটিমাত্র প্রদীপ জ্বালে, তবেই সে আলো আবার ফিরে আসবে।”

 

মিষ্টি তার নব নির্মাণের কথা অর্জুনকে জানিয়ে তারা একত্রে সেই ডিজিটাল প্রজেক্টের নাম পরে 

বদলে দিল। নতুন নাম হলো, “বাংলার আলো – Rewriting Our Roots”

 

এরপর ধীরে ধীরে শহরের তরুণেরা সেই প্রজেক্টে যুক্ত হতে থাকলো। সামাজ মাধ্যমে বাংলা লেখা ফিরে আসতে লাগলো, মঞ্চে আবার নাটক বাংলায় মঞ্চস্থ হতে শুরু হলো। আর একদিন দেখা যায়, “বাংলার আলো” প্রেসের দরজায় নতুন বোর্ড ঝুলছে।

 

“অক্ষররা ফিরে এসেছে।”

এখনও কোনও মন্তব্য নেই

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ঢাল বেয়ে বেয়ে
আহসানুল করিম

ঢাল বেয়ে বেয়ে

সকাল থেকে অফিসে নানা ঝামেলা যাচ্ছিল। প্রোডাকশনের ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডাউন, কোন থার্ড পার্টি সার্ভিসের সাথে যুক্ত হওয়া যাচ্ছে না। হাউকাউ লেগে গেছে কাস্টোমারদের মাঝে। বাসা থেকে রিমোট কাজ করি। তাই একের পর এক কল আর মিটিং-এ যোগ দিতে হচ্ছে। এদিকে বাচ্চাটা জ্বরের কারণে আজকে ইশকুলে যায়নি বলে পাশের ঘরে খেলছে। একটু পর পর কোন একটা কারণে বারবার চিৎকার চেচামেচি করছে। প্রচণ্ড বিশৃংখল একটা পরিস্থিতি। এপার্টমেন্টের নিচে রাস্তায়ও বেশ হৈহল্লা শোনা যাচ্ছে।

গল্প১৪ অক্টোবর, ২০২৬
চিরকুট
মিঠুন মণ্ডল

চিরকুট

অনেক দিন পর রীয়াংশুর সাথে মৈনাকের দেখা হলো। রীয়াংশু মৈনাকের ছেলে বেলার বন্ধু।একসাথে স্কুল, কলেজ আড্ডার আসর,এভাবেই দুজনের বেড়ে ওঠা। রীয়াংশু ভালো স্টুডেন্ট হওয়ায় বর্তমানে ভারতীয় রেলে কর্মরত। মৈনাক বাপের ব্যবসা নিয়েই পড়ে রইলো ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুরে। অল্প বয়সে পেকে যাওয়ায় বিয়েটা অনেক আগেই সেরে ফেলেছে সে। রীয়াংশু সিঙ্গেল, এখনও তার চার হাত এক করার সুযোগ হয়নি।মাঝে মাঝে হাওয়া বদলের জন্য মৈনাক ,অল্প সময়ে ব্যস্ততার ফাঁকে রীয়াংশুর কাছে থেকে সপরিবারে ঘুরে আসে। এবারও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। লোটাকম্বল বগলদাবা করে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি হাজির হলো রীয়াংশুর বাসায়।

গল্প১৩ অক্টোবর, ২০২৬
কালচিনির সুড়ঙ্গ
মোফাজ্জল মণ্ডল

কালচিনির সুড়ঙ্গ

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ। ডুয়ার্সে তখন শীত নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিকেল নামলেই চা বাগানের সারি সারি ঝোপের ওপর কুয়াশা জমতে শুরু করে। দূরে বক্সার পাহাড় অন্ধকার হয়ে আসে, আর জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক। কালচিনির রাতের একটা নিজস্ব শব্দ আছে। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। পাতার ফাঁকে বাতাসের ঘর্ষণ।

গল্প১৩ অক্টোবর, ২০২৬