২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
নষ্ট চরিত্র
নষ্ট চরিত্র

অকৃতদার সেজো কাকা যখন পথ থেকে এক অচেনা পনের-ষোল বছরের মেয়েকে ঘরে এনে তুললেন তখন বাড়ির সবাই অবাক হয়ে গেলেন! আমার দাদি ছিল সেকেলে মানুষ। তাই হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া এই পরিচয়হীন মেয়েকে দেখে উনি বেশ বিরক্ত হলেন। কিন্তু তিনি সেটা কাউকে বুঝতে দিলেন না। আমি ছোট থেকেই দেখেছি দাদির স্নেহ এই সেজো কাকার প্রতি একটু বেশিই ছিল। হয়তো বিয়ে করেননি বা সংসার হয়নি বলেই দাদি সেজো কাকাকে এতটা ভালবাসতেন। যাইহোক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মেয়েটি সংসারের সবার সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠল। প্রতিটি কাজে, আনন্দ উৎসবে সে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে থাকলো। তাকে দেখে কখনো মনে হয়নি যে, সে কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে। বছর দুয়েক পরে হঠাৎ একদিন মধ্যরাতে বড়দের ফিসফিসানিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। কী, কেন শুনতে শুনতে কান খাড়া করে যা শুনলাম, তা শিউরে ওঠার মতো। সেজো কাকার আনা সেই কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটি নাকি সন্তান সম্ভবা! আমি তখন বেশ ছোটো, নয় কিংবা দশ। সবটা বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝেছি, ওই মেয়েটিকে নিয়ে বাড়িতে ঘোরোতর কিছু একটা বিপর্যয় ঘটেছে। যদিও সেই বিপর্যয়ের পরিমাণ কতটা তা মাপার ক্ষমতা আমার ছিল না। ফলে ব্যাপারটার গভীরতা উপলব্ধি করতে না পেরে একটা সময় আমি ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন যখন ঘুম ভাঙলো, দেখলাম বাড়িতে সবাই চুপচাপ। একটা থমথমে পরিবেশ। মেয়েটিকেও কোথাও দেখতে পাচ্ছি না! অন্যদিকে সেজো কাকা আমাদের লম্বা বারান্দার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত উত্তেজিতভাবে হেঁটে চলেছেন আর মনে মনে কী যেন বিড়বিড় করে বলছেন। দাদি তাকে প্রাণপণে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, “ সতু, রাগ করিস না বাবা। একটু শান্ত হ। ব্যাটাছেলেদের একটু আধটু ভুল হতেই পারে। তুই বাড়ি ছেড়ে চলে যাস না খোকা।” কিন্তু সেজো কাকা কোন কথাই শুনতে চান নি। উনি চিরকাল একটু একরোখা এবং নীতিনিষ্ঠ। সেই যে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন আর কখনো ফিরলেন না! সেই শোকে কিনা জানিনা দাদিও বছর ঘুরতে না ঘুরতে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। পরে জেনেছিলাম, ওই মেয়েটির সর্বনাশের জন্য আমার বাবাই দায়ী। আমি বিস্মিত এবং অবাক হয়ে গেলাম। যে বাবাকে প্রতিনিয়ত দেখেছি ঈশ্বরের আরাধনা করতে,কণ্ঠীর মালা জপতে,পাপ থেকে শত হস্ত দূরে থাকার জন্য ঠাকুর ঘরে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে।সেই বাবা কিনা এই কাজ করলেন! এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব স্মৃতি ফিকে হয়ে গেল। আমাদের সংসারও ভুলে গেল সেজো কাকা এবং তাঁর কুড়িয়ে পাওয়া সেই মেয়েটিকে। আমিও পড়াশোনার জন্য দিল্লিতে চলে এলাম। একদিন কলেজ থেকে ফিরছি, প্রচন্ড জ্যাম। গাড়ি সিগন্যালে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ রাস্তার উল্টোদিকে নজর পড়তে আমার চোখ দুটো বিস্ময়ে আটকে গেল…”আরে, সেজো কাকার সেই কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটি না!” মলিন চেহারা, ততোধিক মলিন তার পরিহিত পোশাক। হাতে কয়েক গাছা রজনীগন্ধার মালা। সঙ্গে দশ- এগারো বছরের একটি বাচ্চা। দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি গাড়ির জানালার কাছে গিয়ে ফুলের মালা নেওয়ার অনুরোধ করছে। কেউ নিচ্ছেন, কেউ নিচ্ছে না। একটা সময় সে আমার গাড়ির জানালার কাছে এসে দাঁড়াল,“একটা মালা নেবেন দিদিমণি?” সেই একই কন্ঠস্বর! একটু চাপা হাস্কি। চেহারাটা বুড়িয়ে গেলেও মুখের আদলটার কোন পরিবর্তন হয়নি। প্রথম যেদিন সেজো কাকা মেয়েটিকে আমাদের বাড়িতে এনেছিলেন সেই মায়াময় দেহবল্লরীর অনেকটাই আজ ক্ষয়িষ্ণু। এগুলো নিয়ে যখন ভাবছি হঠাৎ পাশে দাঁড়ানো সেই বাচ্চাটির মুখের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠি।–“এ আমি কী দেখছি! একই মুখ! সঙ্গে চিবুকের নিচে ছোট্ট একটা তিল। ওই তিলটি অবিকল আমার বাবার গালেও দেখেছি!” আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি শিমুল দিদি না!?” মেয়েটি বিস্ময়ে আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ইলেক্ট্রিক শক খাওয়ার মতো গাড়ির কাছ থেকে ছিটকে সরে গেল। আমি জানালা থেকে মুখ বার করে বললাম, ”তোমাকে ঠিকই চিনতে পেরেছি শিমুলদি তুমি যেও না, দাঁড়াও।” ঠিক সেই সময় সিগন্যাল সবুজ হয়ে গেল। পিছনে হর্নের আওয়াজ আর চিৎকারে আমার ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল। দিল্লির বিশাল জনারণ্যে হারিয়ে যাওয়া শিমুলদি ও তার সন্তান আবারও হারিয়ে গেল। কিন্তু রেখে গেল একরাশ প্রশ্ন ও কৌতুহল।

          এরপর বেশ কয়েকবার কলেজ থেকে মেসে ফেরার পথে এই জায়গায় নেমে আমি ওদের অনেক খুঁজেছি। কিন্তু শিমুলদি ও তার সঙ্গের বাচ্চাটির আর কোন খোঁজ পাইনি। দেখা করাটা যে কি ভীষণ জরুরী, তা ও জানে না! দেখা হলে বলতাম,..... “তোমার কিসের লজ্জা শিমুলদি? তুমিই তো মাথা উঁচু করে চলবে! যারা সন্তানের পিতা হয়েও দায় স্বীকার করে না তারাই তো পতিতা। যে সমাজ, যে সংসার তোমার মতো মায়ের দিকে আঙুল তোলে; সেই সংসার, সেই সমাজই তো পতিতা। মহাভারতের কুন্তী সমাজ সংসারের ভয়ে সন্তান ত্যাগ করলেও তিনি সতী! অথচ তুমি সমাজ সংসারের সমস্ত চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে তিল তিল করে নিজের গর্ভে ধারণ করা সন্তানকে এই মুক্ত পৃথিবীর আলো দেখিয়েছ, নব জীবনের জয়গান গেয়েছ… সেই তুমি সতী নও? তুমি তো এ যুগের জানকী। যাকে সতীত্বের পরিচয় দিতে বারংবার অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তুমি নও, লজ্জা পাওয়া উচিত আমার, আমাদের, এ সমাজের। যারা সমস্ত দায়ভার তোমার উপর চাপিয়ে সে রাত্রে তোমাকে আর তোমার আনাগত সন্তানকে গৃহছাড়া করেছিল।”

এখনও কোনও মন্তব্য নেই

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

সংশ্লিষ্ট পোস্ট

ঢাল বেয়ে বেয়ে
আহসানুল করিম

ঢাল বেয়ে বেয়ে

সকাল থেকে অফিসে নানা ঝামেলা যাচ্ছিল। প্রোডাকশনের ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডাউন, কোন থার্ড পার্টি সার্ভিসের সাথে যুক্ত হওয়া যাচ্ছে না। হাউকাউ লেগে গেছে কাস্টোমারদের মাঝে। বাসা থেকে রিমোট কাজ করি। তাই একের পর এক কল আর মিটিং-এ যোগ দিতে হচ্ছে। এদিকে বাচ্চাটা জ্বরের কারণে আজকে ইশকুলে যায়নি বলে পাশের ঘরে খেলছে। একটু পর পর কোন একটা কারণে বারবার চিৎকার চেচামেচি করছে। প্রচণ্ড বিশৃংখল একটা পরিস্থিতি। এপার্টমেন্টের নিচে রাস্তায়ও বেশ হৈহল্লা শোনা যাচ্ছে।

গল্প১৪ অক্টোবর, ২০২৬
চিরকুট
মিঠুন মণ্ডল

চিরকুট

অনেক দিন পর রীয়াংশুর সাথে মৈনাকের দেখা হলো। রীয়াংশু মৈনাকের ছেলে বেলার বন্ধু।একসাথে স্কুল, কলেজ আড্ডার আসর,এভাবেই দুজনের বেড়ে ওঠা। রীয়াংশু ভালো স্টুডেন্ট হওয়ায় বর্তমানে ভারতীয় রেলে কর্মরত। মৈনাক বাপের ব্যবসা নিয়েই পড়ে রইলো ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুরে। অল্প বয়সে পেকে যাওয়ায় বিয়েটা অনেক আগেই সেরে ফেলেছে সে। রীয়াংশু সিঙ্গেল, এখনও তার চার হাত এক করার সুযোগ হয়নি।মাঝে মাঝে হাওয়া বদলের জন্য মৈনাক ,অল্প সময়ে ব্যস্ততার ফাঁকে রীয়াংশুর কাছে থেকে সপরিবারে ঘুরে আসে। এবারও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। লোটাকম্বল বগলদাবা করে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি হাজির হলো রীয়াংশুর বাসায়।

গল্প১৩ অক্টোবর, ২০২৬
কালচিনির সুড়ঙ্গ
মোফাজ্জল মণ্ডল

কালচিনির সুড়ঙ্গ

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ। ডুয়ার্সে তখন শীত নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিকেল নামলেই চা বাগানের সারি সারি ঝোপের ওপর কুয়াশা জমতে শুরু করে। দূরে বক্সার পাহাড় অন্ধকার হয়ে আসে, আর জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক। কালচিনির রাতের একটা নিজস্ব শব্দ আছে। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। পাতার ফাঁকে বাতাসের ঘর্ষণ।

গল্প১৩ অক্টোবর, ২০২৬